ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর একটি। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতিগত বৈচিত্র্যের দেশটি স্বাধীনতার পর থেকেই নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। এর অন্যতম প্রতিফলন দেখা যায়, যখন দেশটির রাষ্ট্রপতি পদে চার চারজন মুসলিম দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদ অলংকৃত করা চারজন মুসলিম ব্যক্তিত্ব হলেন— ড. জাকির হুসেইন, ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ, মুহাম্মদ হিদায়াতউল্লাহ এবং ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম। চারজনের জীবন, কর্ম ও দর্শন ছিল ভিন্ন; কিন্তু একটি জায়গায় তারা একসূত্রে গাঁথা— দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ, অসামান্য অবদান এবং জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা।
ড. জাকির হুসেইন: শিক্ষাবিদ থেকে রাষ্ট্রপতি
ভারতের প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রপতি ছিলেন ড. জাকির হুসেইন। ১৮৯৭ সালে হায়দ্রাবাদে জন্ম নেওয়া এই মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন শিক্ষাবিদ এবং জাতীয়তাবাদী নেতা। তিনি তার স্কুলজীবন সম্পন্ন করেন উত্তরপ্রদেশের ইটাওয়া শহরে। এরপর আলিগড়ের মুহাম্মাদান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। বার্লিন থেকে তিনি অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৪৮ সালে তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫২-৫৭ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষাকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং জাতি গঠনের মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি ভারতের ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে ভারতের মুসলিম ও প্রগতিশীল শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
ড. জাকির হুসেইন বিশ্বাস করতেন, একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে প্রথমেই শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্র ও জনজীবনে অবদানের জন্য ১৯৫৪ সালে তাকে পদ্মবিভূষণ এবং ১৯৬৩ সালে ভারত রত্ন পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়।
তিনি বিহারের রাজ্যপাল হিসেবে ১৯৫৭-১৯৬২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর ভারতের উপরাষ্ট্রপতি (১৯৬২) এবং ১৯৬৭ সালে ভারতের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন বিনয়ী, জ্ঞানী ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক। তবে ১৯৬৯ সালে দায়িত্বে থাকাকালীন তার মৃত্যু ঘটে, যা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে।
ড. জাকির হুসেইনের জীবন ভারতকে শিখিয়েছেন— শিক্ষা, নৈতিকতা ও আদর্শ দিয়েও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব।
ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ: রাজনীতি, দায়িত্ব ও এক অস্থির সময়ের রাষ্ট্রপতি
ভারতের দ্বিতীয় মুসলিম রাষ্ট্রপতি ছিলেন ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ। ১৯০৫ সালে দিল্লিতে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক দীর্ঘদিন ভারতের জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৯২১-২২ সালে তিনি দিল্লির সেন্ট স্টিফেনস কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর ১৯২৭ সালে কেমব্রিজের সেন্ট ক্যাথারিনস কলেজ থেকে ইতিহাসে ট্রাইপোস পাশ করেন। আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ১৯২৮ সালে লন্ডনের ইনার টেম্পল থেকে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ভারতে ফিরে এসে তিনি প্রথমে লাহোরে, তারপর গুয়াহাটিতে আইন পেশায় নিযুক্ত হন।
তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৩৯ সালে তিনি আসামের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৪৬ সালে আসামের অ্যাডভোকেট জেনারেল হন এবং ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত পুনরায় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে জাতীয় মন্ত্রিসভার সদস্য করেন। তারপর ১৯৭৪ সালে তিনি ভারতের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার রাষ্ট্রপতিত্বকাল ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঘোষিত ইমারজেন্সি (১৯৭৫–১৯৭৭) সময়কাল তার রাষ্ট্রপতিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই জরুরি অবস্থার সিদ্ধান্ত ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। ফখরুদ্দিন আলি আহমেদকে অনেক সময় কঠিন সাংবিধানিক মুহূর্তে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। তার সময়কাল দেখিয়েছে, রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অনেক সময় সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে না থাকলেও সাংবিধানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৭ সালে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম: বিজ্ঞানী থেকে জনগণের রাষ্ট্রপতি
ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতিদের তালিকায় নিঃসন্দেহে শীর্ষে থাকবেন ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম। ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ ভারতের রামেশ্বরমে জন্ম নেওয়া আবদুল কালাম সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে নিজ যোগ্যতায় ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
তিনি তামিলনাড়ুর রামানাথাপুরামের শোয়ার্টজ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর ১৯৫৪ সালে তিরুচিরাপল্লীর সেন্ট জোসেফ কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন। ১৯৫৫ সালে মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য মাদ্রাজে চলে আসেন।
তিনি ভারতের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষণায় অসামান্য অবদান রাখেন। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিতে তার ভূমিকার জন্য তিনি ‘Missile Man of India’ নামে পরিচিতি পান। এছাড়া Indian Space Research Organisation (ISRO) এবং Defence Research and Development Organisation (DRDO)-এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এবং ভারতের পরমাণু সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা উন্নয়নে অবদান তাকে জাতীয় নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
২০০২ সালে তিনি ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। যদিও তিনি পেশাদার রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তবুও সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় দ্রুতই হয়ে ওঠেন People’s President বা জনগণের রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি হিসেবেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত কথা বলতেন, তরুণদের স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করতেন, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনকে জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরতেন।
‘Dream is not that which you see while sleeping, it is something that does not let you sleep.’ তার এই বিখ্যাত উক্তি বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। এই একটি বাক্যই যেন তার দর্শনকে ধারণ করে। তার লেখা Wings of Fire, Ignited Minds-সহ একাধিক বই আজও তরুণদের অনুপ্রেরণা দেয়। ২০১৫ সালে শিক্ষার্থীদের সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়েই তার মৃত্যু হয়।
মুহাম্মদ হিদায়াতউল্লাহ : সাংবিধানিক শূন্যতায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ
ভারতের ইতিহাসে তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি দেশের প্রধান বিচারপতি, উপরাষ্ট্রপতি এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি— এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুহাম্মদ হিদায়াতউল্লাহ ১৯০৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ভারতের বর্তমান নাগপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৩০ সালে দ্বিতীয় মেধা ক্রম অর্জন করায় ট্রিনিটি কলেজ থেকে তাকে স্বর্ণপদক দেওয়া হয়।
দেশে ফিরে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন এবং বিচারাঙ্গনে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ভারতের উচ্চ আদালতে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিচারিক প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৬৮ সালে হিদায়াতউল্লাহ ভারতের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সময়কে বিচারব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, যুক্তিবোধ ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশেষ অধ্যায়ে হিদায়াতউল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাকির হুসেইন-এর মৃত্যু এবং পরবর্তীতে উপরাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কারণে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী হিদায়াতউল্লাহ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে তিনি ভারতের উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বিচারপতি ও রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন লেখক ও শিক্ষাবিদ। তার একাধিক লেখা ও বক্তৃতা রয়েছে, যা ভারতীয় আইনশিক্ষার্থীদের জন্য আজো মূল্যবান।
মুহাম্মদ হিদায়াতউল্লাহর জীবন ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় মেধা, সততা এবং সাংবিধানিক নিষ্ঠার এক অনন্য উদাহরণ।
এই মহান ব্যক্তি ১৯৯২ সালে ৮৬ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
ভারতের এই চার মুসলিম রাষ্ট্রপতির জীবন এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়— রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় পরিচয় নয়; বরং যোগ্যতা, জ্ঞান, সততা ও অবদানই আসল পরিচয়। এই চারজন ব্যক্তি চার ভিন্ন জগত থেকে এসেও ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছেছেন। তাদের রাষ্ট্রপতি হওয়া শুধু মুসলিম সমাজের জন্য গর্বের বিষয় নয়; বরং পুরো ভারতীয় গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিফলন। তাদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়— সত্যিকারের নেতৃত্ব জন্ম নেয় আদর্শ, পরিশ্রম, জ্ঞান এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে।
/মহু