রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা নদীর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাট গত দুই বছর ধরে বেদখল অবস্থায় রয়েছে। ইজারা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সরকার হারিয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার রাজস্ব। অন্যদিকে ঘাটগুলো এখন স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় অনিয়ন্ত্রিত টোল আদায়, যাত্রী ভোগান্তি এবং মাদক পাচার বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া গোদাগাড়ীর ছয়টি খেয়াঘাট হলো প্রেমতলী, বিদিরপুর, ফুলতলা, রেলবাজার, হাটপাড়া, ভগবন্তপুর ও সুলতানগঞ্জ। এর মধ্যে চলতি বছর শুধু সুলতানগঞ্জ ফেরিঘাট ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বাকি পাঁচটি ঘাট দুই বছর ধরে ইজারাবিহীন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, পাঁচটি ফেরিঘাটের ইজারা ব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ একসময় বিভাগীয় কমিশনারের দফতর থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়।
রাজশাহী জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ছয়টি ফেরিঘাট থেকেই প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। কিন্তু একই বছরের আগস্টে সরকার পতনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। আন্দোলনরত বিভিন্ন পক্ষ ঘাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ইজারাদারদের সরিয়ে দিয়ে স্থানীয়ভাবে টোল আদায় শুরু হয়। এরপর থেকেই জেলা পরিষদ আর ঘাটগুলো ইজারা দিতে পারেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কখনো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, কখনো জুলাই যোদ্ধা, আবার কখনো এলাকাবাসী ছাত্র-কর্মজীবী জোটের ব্যানারে আন্দোলন করে ইজারা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। চলতি বছরও ইজারা প্রক্রিয়া শুরু হলে উচ্চ আদালতে রিটের মাধ্যমে তা স্থগিত করা হয়।
এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ইশা বলেন, দুই বছর গোদাগাড়ীর পাঁচটি ফেরিঘাট থেকে জেলা পরিষদ এক টাকাও রাজস্ব পায়নি। বারবার ইজারা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বিভিন্ন বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন।
এরশাদ আলী আরও বলেন, ফেরিঘাট জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো সরকারি সম্পদ এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত। ফেরিঘাট বিলুপ্তির দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করা হবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ও পাশের আলাতুলি ইউনিয়ন পদ্মা নদীর কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এসব ঘাট ব্যবহার করে যাতায়াত করেন। কিন্তু সরকারি ব্যবস্থাপনা না থাকায় যাত্রীদের নির্ভর করতে হচ্ছে স্থানীয় কিছু ব্যক্তির পরিচালিত নৌকার ওপর। তারাই নিজেদের মতো ভাড়া আদায় করছে। তবে সেই অর্থের কোনো অংশ সরকারি কোষাগারে জমা পড়ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইজারাদার না থাকায় ঘাট এলাকায় শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। আগে নির্ধারিত নৌযান ও নিয়ন্ত্রিত পারাপার ব্যবস্থা থাকলেও এখন যে যেভাবে পারছে নদী পার হচ্ছে। রাত-দিনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
এলাকাবাসীর আরেকটি বড় উদ্বেগ মাদক পাচার। সীমান্তঘেঁষা চরাঞ্চল হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই পদ্মা নদীপথ মাদক চোরাচালানের ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের দাবি, ইজারা ব্যবস্থা চালু থাকলে অন্তত কিছুটা নজরদারি থাকত। কিন্তু বর্তমানে ঘাটগুলো কার্যত উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বাসিন্দা জানান, দুর্গম চরাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। পর্যাপ্ত নৌযান না থাকায় মাদক কারবারিরা রাতের আঁধারে সহজেই নদীপথ ব্যবহার করছে।
এদিকে কয়েক কোটি টাকায় ঘাট ইজারা নিয়েও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন একাধিক সাবেক ইজারাদার। তাদের অভিযোগ, আন্দোলন ও দখলদারিত্বের কারণে তারা ঘাট পরিচালনা করতে পারেননি। এতে পুঁজি হারিয়ে অনেকেই আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জেলা পরিষদ থেকে কোনো সহায়তা পাননি তারা।
সময়ের আলো/জেডি