বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো বেকারত্ব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো অনুযায়ী দেশের প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ বেকার। দেশের এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। এখন প্রশ্ন হতে পারে, সমস্যার মূল কারণ কোথায়? আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট স্কিলগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
অর্থাৎ এগুলো আলাদা করে শেখানো হয় না। বর্তমান যুগ হলো ডিজিটাল যুগ, যেখানে টিকে থাকতে হলে নিজেকে অন্যদের থেকে আপগ্রেড করতে হবে। দেশে প্রতি বছর লাখো তরুণ পাস করে শিক্ষাব্যবস্থার চৌহদ্দি থেকে বের হচ্ছেন, কিন্তু তাদের জন্য কর্মসংস্থান ও দক্ষতার অভাব বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে শিক্ষার মান ও তার সঙ্গে মিল রেখে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট রয়েছে। শিক্ষা বাজেটে সবচেয়ে কম বরাদ্দ হচ্ছে বৃত্তিমূলক শিক্ষায়, যার ফলে শিক্ষার্থীরা চাকরির জন্য প্রস্তুত হতে পারছে না। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণরাও বেকার হয়ে থাকছে, আর বিদেশে অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে।
দৈনিক সময়ের আলোয় গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেমন জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছে। তারা তাদের শিল্প ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে।
এই দেশগুলোতে প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাকে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে ‘লার্ন অ্যান্ড ওয়ার্ক’ মডেল অনুসরণ করে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
বিপরীতে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক মানসিকতা এখনও নেতিবাচক; অনেক পরিবার মনে করে এটি কম মেধাবীদের জন্য। ফলে শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষায় ঝুঁকে পড়ে, যা চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে মিলছে না।
অপরদিকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বড় দুর্বলতা। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের অভাবে টেকনিক্যাল স্কুল ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর শৈল্পিক মান কম। শিল্প-কারখানার সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ ঝুঁকিপূর্ণ, ফলে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে বাস্তব শিল্প পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পায় না। ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীরা সনদ পেলেও দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেমন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের শিল্পের জন্য দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছে। তারা প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের মূল স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ চীন, যেখানে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতি গড়ে উঠছে, সেখানে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। সিঙ্গাপুরেও দক্ষতা অর্জনকে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়, যা তাদের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশে অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কৌশলী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ বৃদ্ধি করে এবং সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন করে এ দেশের উন্নয়নের গতিকে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
অবশ্যই বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষায় কিছু গুরুত্ব দিয়েছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে রূপান্তর করতে হবে। বিষয়টি শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, সমাজেরও সচেতনতা ও অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তা হলেই আমরা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সক্ষম করে তুলতে পারব, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হব।
দক্ষতা ও প্রযুক্তির যুগে প্রবেশের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে এখনই সময়ের দাবি অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে। তা হলেই তরুণ প্রজন্ম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
অন্যথায় আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবায়ন হবে কেবল অল্পসংখ্যক শিক্ষিতের স্বপ্ন, আর বাকি তরুণরা হয়ে থাকবে শুধু কর্মহীন বেকার। এটা যেমন আমাদের কাছে প্রত্যাশিত নয় , তেমনি শিক্ষা কাঠামোতে কর্মমুখী, প্রযুক্তিনির্ভরতায় জোর দিতে হবে। যাতে করে আগামী প্রজন্ম নিজেদের বিশ্বদরবারে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলে ধরতে পারে ।
সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে কর্মহীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি সহজ হবে- এটাই প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/জেডি