রক্তের সম্পর্কে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে পিতা-মাতার অবস্থান সবার শীর্ষে। কারণ পিতা-মাতাই হচ্ছে সন্তানের সর্বাধিক নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। পিতা-মাতা হাজারো ত্যাগ-তিতিক্ষা আর কুরবানি ও কষ্ট-ক্লেশের মধ্য দিয়ে তিলে তিলে সন্তানকে লালন-পালন করে এবং গঠনে-গড়নে বড় করে তোলে।
তাই স্বাভাবিকভাবেই পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ ও উত্তম ব্যবহারের ফলে জীবন চলার নানা অধ্যায় ও পর্যায়ে প্রভূত বরকত ও রহমত নেমে আসে। পিতা-মাতা সম্পর্কীয় আলোচনা এই প্রবন্ধে তুলে ধরা হলো—
পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় :
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতা সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছি, কেননা তার মা কষ্টের পর কষ্ট সয়ে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। তুমি শোকর আদায় করো আমার এবং তোমার পিতা-মাতার। আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে’ (সুরা লোকমান : ১৪)।
বোঝা গেল, মানুষ যেন তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় করে। কেননা যদিও তাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা কিন্তু বাহ্যিক কারণ হিসেবে তাদের দুনিয়াতে আগমনের পেছনে পিতা-মাতার ভূমিকাই প্রধান। পিতা-মাতার মধ্যেও আবার বিশেষভাবে মায়ের কষ্ট-মেহনতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মা কতই না কষ্টের সঙ্গে তাকে নিজের গর্ভে ধারণ করে রাখে। তারপর একটানা দুই বছর তাকে দুধ পান করায়।
পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ :
মানুষের কর্তব্য সবার সঙ্গেই উত্তম আচরণ করা। আর পিতা-মাতার সঙ্গে তো অবশ্যই উত্তম আচরণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো, পিতা-মাতার কোনো একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৩)
পিতা-মাতার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি :
পিতা-মাতার বৈধ অনুসরণ-অনুকরণের মধ্য দিয়ে তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি নিহিত। আর তাদের অবাধ্য ও বিরোধিতা করে অসন্তুষ্টি অর্জনে মহান আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টি নিহিত। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ হয়। আর তাদের অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টি রয়েছে।’ (তিরমিজি : ১৮৯৯)
পিতা-মাতার হক :
পৃথিবীতে মানুষকে দুই প্রকার হক আদায় করতে হয়- আল্লাহর হক ও বান্দার হক। আর বান্দার হকের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে পিতা-মাতার হক। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, মানুষের মধ্যে আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সর্বাপেক্ষা হকদার কে? তিনি বললেন তোমার মা, সে আবার জিজ্ঞাসা করল, অতঃপর কে? রাসুল (সা.) বললেন তোমার মা, এরপর সে জিজ্ঞাসা করল, অতঃপর কে? রাসুল (সা.) বললেন তোমার মা। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, এরপর কে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার পিতা (মুসলিম : ৬৩৯৪)। এখানে রাসুল (সা.) পিতা-মাতার মধ্যেও সর্বাগ্রে রেখেছেন মায়ের হক।
পিতা-মাতার অবাধ্যতা কবিরা গুনাহ :
রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন সাহাবাদের লক্ষ্য করে বললেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবগত করব না? এ কথাটি তিনি বারবার বললেন, তখন সব সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।’ (বুখারি : ২৬৫৪)
পিতা-মাতার দোয়া অর্জন :
দোয়াকে এমনিতেই ইবাদতের মগজ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যেখানে নিজে দোয়া করলেই আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন, সেখানে সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া সন্দেহাতীতভাবে কবুল হবে। তাই এমন দোয়া পাওয়ার কাজ করা। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন শ্রেণির দোয়া সন্দেহাতীতভাবে কবুল হয়- মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া।’ (আবু দাউদ : ১৫৩৮)
মৃত্যুর পর দোয়া করা :
পিতা-মাতার জন্য সন্তানের ওপর অনেক করণীয় আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সন্তানের উচিত তাদের জন্য দোয়া করা। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের মৃত্যুর পর তার সব আমলের (সওয়াব) বন্ধ হয়ে যায়, অবশ্য তিনটি আমলের (সওয়াব) বন্ধ হয় না- সাদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলমের সওয়াব ও নেক সন্তান পিতা-মাতার জন্য যে দোয়া করে। (মুসলিম : ৪৩১০)
সন্তানের জান্নাত বা জাহান্নাম :
সন্তান যদি পিতা-মাতার খেদমত করে তাদের সন্তুষ্ট করতে পারে এর বিনিময়ে তার জান্নাত লাভ হয়। বিপরীতে যদি তাদের নানাভাবে কষ্ট দেয়, কিংবা তাদের অবাধ্য হয়, তা হলে এর ফলে জাহান্নামে যেতে হবে। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু উমামা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, এক লোক রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করল, সন্তানের ওপর পিতা-মাতার কী হক? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘পিতা-মাতা হয়তো তোমার জন্য জান্নাত, কিংবা জাহান্নাম।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৬৬২)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার যথাযথ খেদমত করে পরকালীন জীবনে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে চিরস্থায়ী ও চিরসুখের জান্নাত লাভ করার তওফিক দান করুন।
মুহাদ্দিস ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/জেডি