একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসার ছিল জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার থুপসাড়া মহল্লার ছালেমা খাতুনের। কিন্তু অদম্য ইচ্ছা ও গবাদিপশু পালনের পরিশ্রমে তিনি এখন সাফল্যের শিখরে। নিজের খামারের আয় দিয়ে তিনি আধুনিক ইটের ফ্ল্যাট বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং ৫–৬ বিঘা বর্গা জমিও নিয়েছেন। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা ও বিয়ের খরচ নির্বাহের পর এখন তিনি এলাকার এক স্বাবলম্বী নারীর দৃষ্টান্ত।
ছালেমা খাতুনের মতো জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই, ক্ষেতলাল, আক্কেলপুর ও সদর উপজেলার হাজারো খামারি এখন গবাদিপশু পালনে খুঁজে পেয়েছেন জীবিকার নতুন দিগন্ত। আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জেলার প্রায় ২৬ হাজার খামারে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পশুপালন এখন মৌসুমি কাজ নয়, বরং এই অঞ্চলের মানুষের অন্যতম লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জয়পুরহাটে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৭৫৩টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার। ফলে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে।
পাঁচবিবির সরাইল-মোহাম্মদপুরের এ এন মহিউদ্দিনের খামারে রয়েছে ১২০টি গরু। অন্যদিকে কালাইয়ের পাঁচশিরা এলাকার আলী আনছার ২০১৫ সালে মাত্র ৫টি গরু দিয়ে খামার শুরু করেন। বর্তমানে তার খামারে ১৯টি গরু রয়েছে।
আলী আনছার জানান, দুধ বিক্রির আয় দিয়ে দৈনন্দিন খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে, আর গরু ও বাছুর বিক্রি থেকে আসে উল্লেখযোগ্য লাভ। প্রতিটি গরু তিনি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করেন, যা তাকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মহির উদ্দিন জানান, খামারিরা এখন ক্ষতিকর ইনজেকশন বা ওষুধের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপায়ে ঘাস, ভুট্টা ও খৈল খাইয়ে পশু মোটাতাজাকরণে আগ্রহী। এতে নিরাপদ মাংস নিশ্চিত হচ্ছে।
এছাড়া জেলার ১০টি স্থায়ী ও ১৭টি অস্থায়ী পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সহায়তায় ১৩টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করবে।
পশুপালনভিত্তিক এই অর্থনীতি গ্রামাঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। গোখাদ্য বিক্রেতা, পশুচিকিৎসক, পরিবহন শ্রমিক এবং বাঁশ-দড়ির ব্যবসায়ীদের আয় বহুগুণ বেড়েছে।
কালাইয়ের গোখাদ্য ব্যবসায়ী জালাল উদ্দীন বলেন, কোরবানির মৌসুমে বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যা গ্রামীণ বাজারকে সচল রাখে। তবে খামারিদের মতে, গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও সহজ শর্তে ঋণের অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
কালাই সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আব্দুল ওহাব সাখিদার বলেন, পশুপালন গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থ প্রবাহ বাড়াচ্ছে এবং নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে। গ্রামের ইটের পাকা বাড়ি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন প্রমাণ করে, গরুর খামার এখন টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠছে।
/এসএকে