দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের প্রথম দিন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় চীন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তার বর্তমান অবস্থান বদলে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করুক, যাতে ইরান আরও দায়িত্বশীল আচরণ করে। তিনি আরও বলেন, এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে তাদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত থামাতে যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের সহযোগিতা চাইছে। কারণ চীন বর্তমানে ইরানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার এবং ইরানি তেলের বড় ক্রেতা। ফলে বেইজিংয়ের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তেহরানকে আলোচনায় আনতে পারবে— এমনটাই আশা করছে ওয়াশিংটন।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, চীন এই ধরনের সরাসরি চাপ বা পক্ষ নেওয়ার পথে যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কৌশলগত স্বার্থ এবং ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সেটি খুব দুর্বল অবস্থায় আছে। পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনা এখনো কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। সংঘাত শুরুর পর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালীতে তাদের কৌশলগত প্রভাব কমাতে হবে। কারণ এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, যুদ্ধের ফলে তাদের যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে এবং লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ করতে হবে— যেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘর্ষ চলছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এসব দাবিকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এগুলো অগ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন যে ইরান অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে।
এদিকে যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশই এই পরিস্থিতির প্রভাব অনুভব করছে।
ট্রাম্প প্রশাসন চীনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ইরান সংকটে একটি নতুন কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে চাইছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের অবস্থান এতটাই ভিন্ন যে, দ্রুত কোনো সমাধান আসবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বুধবার একটি চীনা সুপার ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। জাহাজ-ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, এটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ইরাকি অপরিশোধিত তেল বহন করছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটি হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে চীনা তেলবাহী ট্যাঙ্কারের তৃতীয় পরিচিত যাত্রা।
সূত্র জানিয়েছে, শুধু চীনই নয়, অন্যান্য দেশও ইরাক এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের করা চুক্তির মতো নতুন ধরনের জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। এই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হতে পারে। এই জলপথ দিয়ে সাধারণত সার, পেট্রোকেমিক্যাল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, জাপানের একটি বড় তেল কোম্পানি এনিওস দ্বারা পরিচালিত একটি পানামা-ফ্ল্যাগযুক্ত অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কারও সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে বলে এলএসইজির জাহাজ-ট্র্যাকিং ডেটা জানিয়েছে। এটি এমন জাপান-সংযুক্ত জাহাজের দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রণালী অতিক্রমের ঘটনা হিসেবে ধরা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, কারণ জাপান তার মোট তেল আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে। তাই এই জলপথে যে কোনো উত্তেজনা বা নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচল পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চলমান সংঘাতের মধ্যেও আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নতুন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে জোট পুনর্গঠন ও নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
বুধবার প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসকে ত্বরান্বিত করছে। বিভিন্ন দেশ ও জোট তাদের অবস্থান নতুনভাবে সাজাতে শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের দাবি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্চ মাসে গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন এবং সেখানে শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার পর এই সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ধরনের গোপন সফরের দাবি অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, অঘোষিত সফর বা অঘোষিত কোনো ব্যবস্থার দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করেছে যে, ইসরাইল ও তার সহযোগীদের সঙ্গে কিছু আঞ্চলিক দেশ গোপনে সম্পর্ক রেখে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে শত্রুতা করা একটি “বোকামি জুয়া”। তিনি আরও বলেন, যারা ইসরাইলের সঙ্গে সহযোগিতা করে বিভাজন সৃষ্টি করছে, তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
এদিকে পৃথক একটি প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে সৌদি যুদ্ধবিমান ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে। একইসঙ্গে কুয়েত থেকে ইরাকে পাল্টা হামলা পরিচালিত হয়েছে বলেও সূত্রের দাবি। এসব ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চলে গোপন সামরিক তৎপরতার একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হচ্ছে। তিনি হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, মূল প্রশ্ন হলো— এতটুকু অগ্রগতি হয়েছে কি না, যাতে প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত লাল রেখা পূরণ করা যায়।
তিনি আরও বলেন, সেই লাল রেখা খুবই স্পষ্ট— ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
অন্যদিকে ইরান বারবার দাবি করে আসছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না।
/ইউএমএইচ