বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের বিষয় হলো, এসব ঘটনার বড় একটি অংশের শিকার হচ্ছে শিশু। বিশেষ করে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুরাও এখন নিরাপদ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও ঘটনা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে দেশে অন্তত ৫৬ জন ১২ বছরের কম বয়সী শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে মোট ১৮০টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ৮১ জন ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ বছরের নিচে। অর্থাৎ ঘর, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি তাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এমন ঘটনার শিকার শিশুরা ট্রমা, বিষণ্নতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে। অনেকেই লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ে এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অথচ সমাজে এখনো অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা দেখা যায়।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় শিশু নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তরা পরিচিত মানুষ। শিক্ষক, আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠছে। নেত্রকোনার মদন উপজেলার একটি ঘটনায় ১১ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রী ধর্ষণের ফলে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন শিক্ষক বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে রাতে হলে ফেরার পথে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে এবং নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানায়। তারা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যৌন সহিংসতা বাড়ার অন্যতম বড় কারণ বিচারহীনতা। অনেক ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত দীর্ঘ হয়, প্রভাবশালীদের চাপ থাকে, আবার অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবারকে আপস করতে বাধ্য করা হয়। ফলে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায় এবং সমাজে ভুল বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত বিচার এবং নিশ্চিত শাস্তি ছাড়া শুধু কঠোর আইন দিয়ে অপরাধ কমানো সম্ভব নয়।
সামাজিক অবক্ষয়কেও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হচ্ছে। নারীর প্রতি অসম্মান, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা যৌন সহিংসতা বাড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নারীবিদ্বেষী ও সহিংস মনোভাব ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাও এখনো দুর্বল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। থানা পর্যায়ে শিশু-বান্ধব পরিবেশ, ফরেনসিক সহায়তা এবং মানসিক কাউন্সেলিংয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। অনেক পরিবার অভিযোগ করেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল সক্রিয় করা, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও সিসিটিভি স্থাপন, নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা এবং শিশুদের বয়স উপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া জরুরি।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা, সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, নারী ও শিশু নিরাপত্তা শুধু একটি সামাজিক ইস্যু নয়, এটি রাষ্ট্রের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিটি শিশু যেন নিরাপদ শৈশব পায় এবং প্রতিটি নারী যেন ভয় ছাড়া চলাফেরা করতে পারে, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরবিএন