মুসলিম উম্মাহর কেবলা পবিত্র কাবা শরিফ। এটি মুমিন মুসলমানের সবচেয়ে প্রিয় ও পবিত্র স্থান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতি বছর এ কাবার জিয়ারতে আসে লাখ লাখ-কোটি মুসলিম জনতা। তারা লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলে কাবা চত্বর। এ কাবা সম্পর্কে কিছু বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরেছেন আবিদ রাইহান
কাবাঘর নির্মাণ : পবিত্র কাবা প্রথম নির্মাণ করেন প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.)। দ্বিতীয়বার এটি উদ্ধার ও নির্মাণ করেন হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.)। বর্তমানে কাবার যে অবকাঠামো, তা প্রিয় নবীজি (সা.)-এর জীবনকালের সময় এমন ছিল না।
বর্তমান সময় পর্যন্ত তা বেশ কয়েকবার সংস্কার করে এর উন্নয়ন করা হয়েছে। সবশেষ ১৯৯৬ সালে উন্নত সরঞ্জাম ও পাথরের ব্যবহারে কাবা চত্বরসহ এর বেশ কিছু উন্নয়নকাজ করার মাধ্যমে কাবার ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী ও মজবুত করা হয়।
বর্তমান অবকাঠামো, দরজা ও জানালা : সৌদি গেজেটের তথ্যমতে, কাবাঘরের উচ্চতা পূর্ব দিকে ১৪ মিটার (অন্য একটি সূত্রে তা ১২.৮৪ মিটার), পশ্চিম দিকে ১২.১১ মিটার, উত্তর দিকে ১১.২৮ মিটার এবং দক্ষিণ দিকে ১২.১১ মিটার। কাবাঘরের দুটি দরজা ছিল।
একটি প্রবেশের জন্য আর অন্যটি বের হওয়ার জন্য। আর ছিল একটি জানালা। বর্তমানে একটি দরজাই রাখা হয়েছে। ভূমি থেকে ২.৫ মিটার উচ্চতায় রয়েছে কাবার দরজা। এটির দৈর্ঘ্য ৩.০৬ ও প্রস্থ ১.৬৮ মিটার। দরজাটি বাদশা খালেদ ২৮০ কেজি স্বর্ণ দ্বারা তৈরি করে উপহার দেন।
কাবাঘরের চাবি : মক্কা বিজয়ের পর নবীজি (সা.) কাবাঘরের চাবি বনি শায়বা গোত্রের ওসমান ইবনে তালহা (রা.)-এর কাছে হস্তান্তর করেন। বংশ পরম্পরায় এখনও তারাই কাবাঘরের চাবির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অনেক দিন ধরেই কাবাঘরের বিভিন্ন ধরনের বিশেষ তালা ও চাবির ব্যবহার হয়ে আসছে। দীর্ঘ দিন পরপর পরিবর্তন করা এসব তালা কিংবা চাবি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
এখন পর্যন্ত কাবা শরিফে ৫৮টি তালা-চাবির নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া যায়। যার মধ্যে তুরস্কের সাবেক রাজধানী ও প্রাচীন শহর ইস্তানবুলের তোপকাপি জাদুঘরেই রয়েছে ৫৪টি চাবি। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের একটি জাদুঘরে রয়েছে দুটি চাবি এবং মিসরের রাজধানী কায়রোর ইসলামি আর্ট জাদুঘরে রয়েছে একটি চাবি। কাবা শরিফের চাবি রাখার জন্য কিসওয়ার কাপড় দ্বারা তৈরি বিশেষ বাক্স তৈরি করা হয়। যার মধ্যে রাখা হয় পবিত্র কাবা শরিফের চাবি।
সাঁতার কেটে তওয়াফ : এখন পর্যন্ত দুবার কাবা চত্বর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। একবার ইসলামের স্বর্ণ যুগে। আর দ্বিতীয়টি ১৯৪১ সালে। ১৯৪১ সালে সপ্তাহব্যাপী প্রবল বৃষ্টির কারণে কাবা চত্বরসহ মক্কার বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। আর সে সময় কাবাঘর জিয়ারতকারীদের কেউ কেউ সাঁতার কেটে তওয়াফ করেন।
সে সময় সপ্তাহব্যাপী বৃষ্টির কারণে কাবা চত্বরে প্রায় ৬ ফুট পানি জমে যায়। তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনকালের সময়ও একবার কাবা চত্বরে পানি জমে থাকার তথ্য জানা যায়। সেসময় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) সাঁতরে কাবা তওয়াফ করেছিলেন বলে জানা যায়।
হাজরে আসওয়াদ ভাঙা : কাবা শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে স্থাপিত কালো পাথরটি হলো হাজরে আসওয়াদ। জান্নাত থেকে আসা পথরটি ইতিহাসের বিভিন্ন সময় ভাঙনের শিকার হয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী ৬০৫ খ্রিস্টাব্দে নবীজি (সা.) বিরাট দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে বিভিন্ন গোত্রের লোকদের সহায়তায় নিজ হাতে তা কাবা ঘরের কোণে স্থাপন করেন।
তারপর ৬৪ হিজরিতে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর শাসনকালের সময় কাবাঘরে আগুন লাগলে হাজরে আসওয়াদটি ভেঙে একাধিক খণ্ড হয়ে যায়। কেউ কেউ বলেন এটি তিন খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়।
পরে তিনি এটিকে রুপার আবরণ দিয়ে একত্রিত করে পুনরায় কাবা চত্বরে স্থাপন করেন। ৩১৭ হিজরিতে পূর্ব আরবের কারামতি সম্প্রদায় কাবাঘর আক্রমণ করে ভাঙচুর ও লুণ্ঠন চালায়। কাবাঘরের বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে হাজরে আসওয়াদও লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় তারা।
২২ বছর পর পাথরটি তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। লুণ্ঠনের সময় পাথরটি ব্যাপক ক্ষতি ও টুকরো টুকরো হয়ে যায়। হাজরে আসওয়াদের ভাঙা অংশগুলোর মধ্যে এখনও কয়েকটি খণ্ড নিখোঁজ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন এখনও ৮ খণ্ড পাথর নিখোঁজ অবস্থায় রয়েছে। হাজরে আসওয়াদের ভাঙা অংশগুলো কাদামাটি, মোম, অম্বর ইত্যাদি দিয়ে মেরামতপূর্বক বাঁধাই করে রাখা হয়েছে।
পবিত্র কাবাঘরের অভ্যন্তরে নামাজ : কাবাঘরের বাইরে তওয়াফের চত্বরে কাবাঘরের চারপাশে দাঁড়িয়েই মানুষ নামাজ আদায় করে। কিন্তু যারা কাবাঘরের ভেতরে ঢুকে নামাজ আদায় করে, তারা কোন দিকে ফিরে নামাজ আদায় করে? এ কৌতূহল কিংবা প্রশ্ন অনেকেরই।
কাবাঘরের ভেতরে যেকোনো দিকে ফিরেই নামাজ আদায় করা যায়। তাতে কোনো বিধিনিষেধ নেই। আবার কাবাঘরের বাইরেও যেকোনো পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ
পড়া যায়। তবে কাবাঘরের ইমামরা বেশিরভাগ সময় মাকামে ইবরাহিম চত্বরে বর্তমান দরজার সামনে দাঁড়িয়েই নামাজ পড়ান।