আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন

রাকিবুল রকি

সাহিত্য

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। একটু দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। যেন কুয়াশা পড়েছে। অথচ ঘণ্টাখানেক আগেও ছিল বাঘের মতো রোদ। পুড়িয়ে

2026-05-15T18:03:55+00:00
2026-05-15T18:03:55+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন
রাকিবুল রকি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ৬:০৩ পিএম 
আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন। ছবি : সংগৃহীত
ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। একটু দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। যেন কুয়াশা পড়েছে। অথচ ঘণ্টাখানেক আগেও ছিল বাঘের মতো রোদ। পুড়িয়ে দিচ্ছিল সব। বৈশাখ এমনই। বলা ভালো গ্রীষ্মের চারিত্র্যটা এমনই। মাঠ-ঘাট সব পুড়িয়ে দেয়। আগুন ঝরে আকাশ থেকে। আবার যখন বৃষ্টি আসে, সব জুড়িয়ে জল। কখনো বান ডাকে। ভেসে যায় ক্ষেত। ফসল। মুষলধারে বৃষ্টি দেখতে দেখতে মনে পড়ল, সেই কবে, কত শত বছর আগে, নাকি হাজার বছর আগে, এ দেশের কিছু গুণীজন এক বিশেষ দিনে পুব আকাশে বিশাখা নক্ষত্রের কোলঘেঁষে সূর্যকে উঠতে দেখলেন। সেই বিশাখার নামানুসারে মাসের নাম রাখলেন বৈশাখ। অবশ্য বাংলা মাসের সবকটা মাসের নামই নক্ষত্রের নামানুসারে। 

যাই হোক, বাদ দিই জ্ঞানের কচকচানি। বৃষ্টির দিনে যুক্তির চেয়ে কল্পনার ভেলা ভাসাতে ভালো লাগে। আচ্ছা, চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ফুল্লরার বারোমাসের যে দুঃখের চিত্র এঁকেছেন, তা কি তার পরিচিত কোনো নারীর ছবি? নাকি প্রকৃত জনপদের চিত্র? ফুল্লরা যখন চণ্ডীদেবীকে তার বারো মাসের দুঃখের কথা বলতে শুরু করেন, শুরুতেই তিনি গ্রীষ্মের বর্ণনা দেন। বলেন-

ভেরান্ডার খাম তার আছে মধ্য ঘরে।
প্রথম বৈশাখ মাসে নিত্য ভাঙে ঝড়ে।
অনল সমান পোড়ে বৈশাখের খরা।
তরুতল নাহি মোর করিতে পসরা।
পদ পোড়ে খরতর রবির কিরণ।

আরও কয়েক পঙ্ক্তিতে গ্রীষ্মের বর্ণনা রয়েছে। তবে এখানে মোটাদাগে আমরা গ্রীষ্মের একটা চিত্র দেখতে পাই। দরিদ্র মানুষ। ঘরের মধ্যে ভেরান্ডার খাম। সেই ঘর ঝড়ে ভেঙে যায় বৈশাখের শুরুতেই। আজও তো গরিবের অভিধান থেকে বৈশাখের এই অর্থ মুছে যায়নি। আগের কথায় ফিরে আসি। আমরা জানি, কালবৈশাখী চৈত্রের শেষ না হতেই নামতে শুরু করে। তাই বৈশাখ শুরু হতেই যে নড়বড়ে ঘর কালবৈশাখীতে ভেঙে পড়বে, তাতে আর সন্দেহ কোথায়। ওদিকে তীব্র রোদের কারণে কেনাবেচাও ঠিক মতো করতে পারে না। তারা এতই দরিদ্র যে, পরনের কাপড়ও অপ্রতুল। তাই তো, রোদ থেকে বাঁচার জন্যে শরীরের কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকা যায় না। বৈশাখ এবং জ্যৈষ্ঠকে বিষতুল্য মনে হয়েছে তার কাছে। এখানে সাধারণ জনজীবনের খাদ্যাভ্যাসের একটি চিত্র দেখতে পাই। মানুষজন এই সময়টাতে নিরামিষ খেয়ে থাকে। কেউ মাংস খায় না। 

সনাতন ধর্মে এই রীতি এখনও অনুসরণ করা হয়ে থাকে। অন্তত পহেলা বৈশাখের আগে তারা কিছুদিন নিরামিষ ভোজন করে। মধ্যযুগে কবি আলাওল ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে গ্রীষ্মের দাবদাহের চিত্র এঁকেছেন। সেই সঙ্গে গ্রীষ্মের পুষ্পপল্লবের কথাও বলতে ভোলেননি। তিনি লিখেছেন-

‘নিদাঘ সমএ অতি প্রচণ্ড তপন।
রৌদ্র ত্রাসে রহে ছায়া চরণে সরণ’

ঋতুর বর্ণনা দিতে গিয়ে আলাওল তার রসিক মনকে আড়াল করতে পারেননি। প্রচণ্ড গরমে ছায়া যেমন পায়ের নিচে গিয়ে লুকায়, ঠিক তেমনি এই মাসের বাতাস চন্দন, চম্পকের ঘ্রাণে আমোদিত হয়ে থাকে। এখানেই শেষ নয়, মদন অর্থাৎ কামের দেবতা বা প্রেমের দেবতা সবসময় দম্পতির সঙ্গে থাকে। কেন সঙ্গে থাকে, কারণটা ভেবে নেওয়ার দায়িত্ব আলাওল হয়তো পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। 

গ্রীষ্মের কালবৈশাখীর কথা অনেক সাহিত্যে উঠে এলেও গরম, তীব্র রোদ, খরা-ই যে এর প্রধান স্মারক হয়ে উঠে এসেছে। ভোরের পাখি খ্যাত বিহারীলাল চক্রবর্তী ‘সংগীত-শতক’ বইয়ের একটি গানে লিখেছেন-

‘প্রদীপ্ত অনল-শিখা
ধক্ ধক্ দিনকর!
যেন চতুর্দ্দিক জ্বলে
এ কি দেখি ভয়ংকর!’

এখানে সূর্যের মধ্যে ধকধক করে আগুন জ্বলার চিত্র কল্পনা করেছেন তিনি। রোদকে তুলনা করেছে অগ্নিপূর্ণ বাণ অর্থাৎ আগুন জ্বলা তীরের সঙ্গে। ফলে স্বভাবতই মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এই গানের শেষ স্তবকে তিনি বলেছেন চাতকের কথা। তৃষ্ণার্তের প্রতীক চাতক। বৃষ্টির জল যার আরাধ্য। বৃষ্টিহীন গ্রীষ্মে তাই জল চেয়ে তৃষ্ণায় ছটফট করতে থাকে। তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। কখন মেঘ জমবে? বৃষ্টি হবে?

‘ঊর্ধ্বমুখে শূন্যোপরে
কাঁদিছে কাতর স্বরে
যায় যায় প্রায় প্রাণ
চাতক খেচরবর।’

বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস। বৈশাখ থেকেই শুরু হয় গ্রীষ্ম ঋতু। ফলে স্বভাবতই বৈশাখের আগমনে পুরোনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে বরণ করে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বৈশাখ তাই শুধু গরম আর কালবৈশাখীর মাস নয়, নতুনকে বরণ করে নেওয়ারও মাস। অতীতের গ্লানি, জরাজীর্ণতাকে ভুলে যাওয়ার মাস। বুক ফুলিয়ে, মাথা উঁচু করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ বলে বৈশাখকে স্বাগত জানিয়েছেন। আজকে রবীন্দ্রনাথের এই গান ছাড়া আমাদের বৈশাখকে বরণ করে নেওয়া যেন অসম্পূর্ণ থাকে। রবীন্দ্রনাথ যেমন বৈশাখকে নতুনের আগমনী হিসেবে কল্পনা করেছেন, ঠিক একইভাবে কালবৈশাখীকেও কাজী নজরুল ইসলাম তারুণ্যে প্রতীক, নতুনের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। 

বলেছেন, ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখীর ঝড়’। এই ঝড় যেমন তার কাছে নতুনত্বের প্রতীক, ঠিক একইভাবে অন্যায়, অত্যাচার ধ্বংস করে দেওয়ার হাতিয়ার। 

রবীন্দ্রসাহিত্যের কাছে ফিরে আসি। তিনি সাহিত্যে কেবল গ্রীষ্মের প্রতিকৃতিই তুলে ধরেননি। বরং কখনো কখনো গ্রীষ্মের প্রকৃতির মাধ্যমে মানব মনের ভাবও প্রকাশ করেছেন। হৃদয়ের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্যে অন্যান্য ঋতুর মতো গ্রীষ্মকেও ব্যবহার করেছেন। অনেকেই কেঁদে তাদের মনের ভাব লাঘব করতে পারে না। হৃদয়ের কথা তাদের বুকের ভেতরই গুমরে গুমরে কাঁদে। কেউ জানতেও পারে না। বুঝতে পারে না। চোখ সজল না হলেই যে মানুষ কাঁদতে পারে না, তা তো নয়। 

এই যে বুকের ব্যথা বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখা, হাসি দিয়ে কান্না আড়াল করে রাখা, বোঝানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ মেঘশূন্য গ্রীষ্মের উপমা ব্যবহার করেছেন। ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা’ গানে লিখেছেন, ‘আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন, সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে।’ 

এ ছাড়া ‘হৈমন্তী’ গল্পের সেই উক্তি ‘জ্যৈষ্ঠের খররৌদ্রই তো জ্যৈষ্ঠের অশ্রুশূন্য রোদন’, আজ প্রবাদতুল্য হয়ে গেছে। তীব্র শোকে মানুষের পাথর হয়ে যাওয়া বোঝাতে এরচেয়ে যথাবাণী আর কী হতে পারে? তীব্র শোক, বেদনা, এতটাই ভয়ংকর যে, মানুষের পক্ষে তা দু ফোঁটা চোখের জল ফেলে সেই ভার কমানো সম্ভব নয়। কেবল জ্যৈষ্ঠের প্রকৃতির মতো নিজে নিজে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। 

গ্রীষ্মের দুপুরে সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর থাকে, তাঁতানো রোদে ভরে থাকে চারপাশ, বিস্তীর্ণ মাঠের দিকে তাকালেই দেখা যায় মাটি থেকে ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে। দূরের দৃশ্যগুলো টিভির পর্দার ছবির মতো কাঁপতে থাকে। গ্রীষ্মের দুপুরে গ্রামে পারত পক্ষে কেউ বাইরে থাকতে চায় না। মাঠ ঘাট জনশূন্য হয়ে যায়। পথিক ক্লান্ত হয়ে পড়ে খুব সহজেই। তবে পথিকের এই দুর্দশা শুধু গ্রামেই নয়, শহরেও। কারণ রোদ তো রোদ না, যেন আগুনের ফুলকি। ফজলুর রহমান ‘গ্রীষ্মের দুপুরে’ ছড়ায় লিখেছেন-

‘ঘাম ঝরে 
দরদর
গ্রীষ্মের দুপুরে
খালবিল
চৌচির,
জল নেই পুকুরে।’

বৈশাখ মাসে নদীর পানি যেমন কমে যায়, তেমনি অনেক ছোট পুকুর প্রায় শুকিয়ে যায়। জল গিয়ে ঠেকে তলানিতে। অনাবৃষ্টির ফলে প্রকৃতি ও মানুষ তৃষ্ণাকাতর হয়ে পড়ে বৃষ্টির জন্য। কেননা গ্রীষ্মের রোদের সঙ্গে আগুনই লাগসই উপমা। এই আগুনের পোড়ন এবং পীড়ন থেকে বাঁচার জন্য বৃষ্টিই যেন ত্রাণকারী। তাই আকাশে এক চিলতে মেঘ দেখলেও মানুষ ভাবে, হয়তো বৃষ্টি এসে জুড়িয়ে দেবে প্রকৃতি। কিন্তু সেই মেঘ যখন কেটে যায়, মনে হয় কোনো ডাকাত এসে সব মেঘ লুট করে নিয়ে গেছে।
‘আকাশ ভীষণ খাঁখাঁ, একরত্তি মেঘ নেই, শুধু
তরল আগুন গ’লে পড়ছে চৌদিকে।...
... হঠাৎ কখনো 
জমে মেঘ; মনে হয়, হয়তোবা বৃষ্টি হবে ঘন,
হৃদয়-ডোবানো-বৃষ্টি। কোত্থেকে ডাকাত এসে সব
কালো মেঘ লুট ক’রে নিয়ে যায়; দিগন্ত নীরব।
(অনাবৃষ্টি, শামসুর রাহমান)

তবে এই গ্রীষ্মের হয়েছে এক জ্বালা। যখন অনাবৃষ্টি থাকে, সবাই দলবেঁধে চাইতে থাকে বৃষ্টি। নূহের প্লাবন। কিন্তু যখনই সে ঝড়ের ডানায় ভর করে দমকা হাওয়া নিয়ে আসে, নিয়ে আসে কালবৈশাখীর মত্ত ঝাপটা, তখনই আবার শুরু হয় উল্টো গাজন। কবি বলে উঠেন-

‘যে বাতাস বুনোহাঁসের ঝাঁক ভেঙে যায়
সেই পবনের কাছে আমার এই মিনতি
তিষ্ঠ হাওয়া, তিষ্ঠ মহাপ্রতাপশালী
গরিব মাঝির পালের দড়ি ছিঁড়ে কী লাভ?
কী সুখ বলো গুঁড়িয়ে দিয়ে চাষির ভিটে?’
(বোশেখ, আল মাহমুদ)

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   সাহিত্য 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: