সাত মাসে যতবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে সাত মাস। দুই বছরের যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ইসরায়েল বারবার সেই চুক্তি

2026-05-15T23:00:29+00:00
2026-05-15T23:01:25+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
সাত মাসে যতবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১১:০০ পিএম  আপডেট: ১৫.০৫.২০২৬ ১১:০১ পিএম
গাজা সিটির শাতি শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলার স্থান পরিদর্শন করছেন ফিলিস্তিনিরা। ছবি : মিডল ইস্ট আই
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে সাত মাস। দুই বছরের যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ইসরায়েল বারবার সেই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাণঘাতী বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ, ত্রাণ সহায়তা প্রবেশে বাধা, সীমান্ত বন্ধ এবং ‘নো-গো জোন’ সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপের কারণে গাজার মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। 

ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর দাবি, যুদ্ধবিরতির পরও প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল, যদিও যুদ্ধের শুরুর সময়ের তুলনায় হামলার মাত্রা কিছুটা কম ছিল। তবুও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট অব্যাহত রয়েছে। 

হামলা

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির প্রথম ছয় মাসে অন্তত ২ হাজার ৪০০টি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরপরও আরও বহু ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে ছিল অন্তত ১ হাজার ১০৯টি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ এবং বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে ৯২১টি গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৪ মে পর্যন্ত এসব হামলায় অন্তত ৮৫৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৪৮৬ জন আহত হয়েছেন। ইউনিসেফ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ২২৯ জন শিশু ছিল। 

এছাড়া একই সময়ে অন্তত ৫০ জনকে নির্বিচারে আটক করার অভিযোগও রয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে।

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল বেসামরিক মানুষের আস্তানা, বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবির, পুলিশ সদস্য, সাংবাদিক এবং ত্রাণ কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তিরাও। 

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলছে, কিছু হামলা ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাব হিসেবে চালানো হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের বড় অংশই ছিল নারী ও শিশুসহ সাধারণ বেসামরিক মানুষ।   

যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়ন নিয়েও এখনো অগ্রগতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তির পরবর্তী ধাপে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন, গাজার পুনর্গঠন এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মতো বিষয় ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেসব বাস্তবায়ন হয়নি।

এদিকে গাজার কাছে ইসরায়েলের সামরিক সমাবেশ এবং নতুন করে হামলার হুমকি যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্যে বেসামরিক মানুষের আস্তানা , বাস্তুচ্যুতদের শিবির, পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং ত্রাণকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও রয়েছে। 

এছাড়া ইসরায়েলি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে গাজার উপকূলের কাছে জেলেদের এবং সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ওপর বারবার গুলি চালানো ও কয়েকজনকে আটক করার অভিযোগ উঠেছে। 

গত মাসে গাজার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে ইসরায়েলি গানবোটের গুলিতে এক ফিলিস্তিনি নারী নিহত হন। 

ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭২ হাজার ৭০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া আরও হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

‘ইয়েলো জোন’ সম্প্রসারণের অভিযোগ 

২০২৫ সালের অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বলা হয়েছিল, চুক্তির সময়কার ‘যুদ্ধরেখা’ পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে।

এই ব্যবস্থার ফলে তৈরি হয় তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’, যা মূলত ইসরায়েলের নির্ধারিত একতরফা সীমারেখা। এই সীমারেখার ভেতরের বিশাল এলাকাকে ‘নো-গো জোন’ ঘোষণা করা হয়, যেখানে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।   

চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ইসরায়েলি বাহিনী উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব গাজাসহ উপত্যকার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছিল।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পরবর্তী ধাপে ধীরে ধীরে পুরো গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর অভিযোগ, বাস্তবে তার উল্টোটা ঘটেছে।  

তাদের দাবি, এরপর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ‘ইয়েলো লাইন’ আরও সম্প্রসারণ করেছে এবং বর্তমানে গাজার প্রায় ৬৪ শতাংশ এলাকা কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের গাজার অর্ধেকেরও কম এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে থাকতে হচ্ছে। 

এছাড়া যুদ্ধবিরতির মধ্যেও প্রায় প্রতিদিন বাড়িঘর ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে। বেশিরভাগ ধ্বংসযজ্ঞ ‘ইয়েলো জোন’-এর ভেতরে হলেও, ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রিত এলাকাতেও ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের জানুয়ারির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির প্রথম তিন মাসেই ইসরায়েল ২ হাজার ৫০০টির বেশি ভবন ধ্বংস করেছে। 


চলমান অবরোধ ও ত্রাণ সংকট 

যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরায়েলের গাজায় ত্রাণ সরবরাহের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার কথা ছিল। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার কথা ছিল, যেগুলো খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, আশ্রয় সামগ্রী এবং বাণিজ্যিক পণ্য বহন করবে।

তবে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সেই প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তাদের অভিযোগ, ইসরায়েলের অব্যাহত বিধিনিষেধ গাজার মানবিক সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে এবং ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।  

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত গাজায় প্রবেশ করেছে মাত্র সাড়ে ৪ হাজারের কিছু বেশি ত্রাণের ট্রাক। অথচ চুক্তি অনুযায়ী এই সময়ে অন্তত ১৮ হাজার ট্রাক প্রবেশ করার কথা ছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত সহায়তার মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ গাজায় পৌঁছেছে। 

হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ২০০টির কিছু বেশি ট্রাক গাজায় ঢুকেছে, যা চুক্তিতে নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম।

সীমিত সহায়তার কারণে খাদ্যের পাশাপাশি আশ্রয় সংকটও তীব্র হয়েছে। তাঁবু, ভ্রাম্যমাণ ঘর, প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জ্বালানির মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। 

মানবাধিকার সংগঠন ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, চলমান অবরোধের কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আবারও খাদ্য সংকট বাড়ছে। অনেক বাসিন্দা আশঙ্কা করছেন, গাজা আবার দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। এর আগে আগস্টে ইসরায়েলের অবরোধের পর গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছিল। 

এদিকে চিকিৎসক ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা বলছেন, জ্বালানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে তারা পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিতে পারছেন না। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।  

সীমান্ত বন্ধ ও ভ্রমণ বিধিনিষেধ

যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে ইসরায়েলি বাহিনীকে দক্ষিণ গাজার রাফাহ ক্রসিং থেকে সরে যাওয়ার কথা ছিল, যাতে মিশরের সীমান্ত দিয়ে মানুষের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে হাজারো আহত ফিলিস্তিনির বিদেশে জরুরি চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য ছিল এই ব্যবস্থার।  

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রায় চার মাস রাফাহ ক্রসিং বন্ধ রাখা হয়।

ফেব্রুয়ারিতে সীমিতভাবে ক্রসিং খুলে দেওয়া হলেও তখন প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০ জন ফিলিস্তিনিকে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় এবং গাজা থেকে বের হওয়ার সংখ্যা প্রায় ১৫০ জনে সীমিত রাখা হয়।

তবে এই সীমিত ব্যবস্থাও নিয়মিতভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কখনো যাত্রীদের আটকে দেওয়া হয়েছে, আবার দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্রসিং সম্পূর্ণ বন্ধও রাখা হয়েছে—  বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত বাড়ার সময়। 

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে মোট ৬ হাজার মানুষের সীমান্ত পার হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে মাত্র ১ হাজার ৫৬৭ জন পার হতে পেরেছেন, অর্থাৎ মাত্র ২৬ শতাংশ লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, চিকিৎসা নিতে বিদেশে যেতে না পারার কারণে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ জন ফিলিস্তিনি মারা যাচ্ছেন, যা এই বিধিনিষেধের মানবিক প্রভাবকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। 



/ইউএমএইচ

  বিষয়:   যুদ্ধবিরতি  ইসরায়েল 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: