অহংকারে পার্থিব ও পারলৌকিক ক্ষতি

মুহিবুল হাসান রাফি

ইসলাম

অহংকার মানুষের অন্তরের এমন এক অদৃশ্য আগুন, যা বাইরে থেকে কখনো রাজসিক, কখনো আত্মবিশ্বাস বলে মনে হতে পারে; কিন্তু ভেতরে

2026-05-16T05:38:27+00:00
2026-05-16T05:38:27+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
অহংকারে পার্থিব ও পারলৌকিক ক্ষতি
মুহিবুল হাসান রাফি
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ৫:৩৮ এএম 
প্রতীকী ছবি
অহংকার মানুষের অন্তরের এমন এক অদৃশ্য আগুন, যা বাইরে থেকে কখনো রাজসিক, কখনো আত্মবিশ্বাস বলে মনে হতে পারে; কিন্তু ভেতরে ধীরে ধীরে বিশ্বাস, বিবেক, নম্রতা এবং আল্লাহর ভয় সবকিছুকে পোড়াতে থাকে। অহংকার শুধু একটি গুনাহ নয়, এটি আধ্যাত্মিক অন্ধত্বের সূচনা। মানুষ যখন নিজের অবস্থান, ক্ষমতা, যোগ্যতা বা সাফল্যকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে না দেখে নিজের কৃতিত্ব বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখনই পতনের দরজা নিঃশব্দে খুলে যায়। দুনিয়া যখন কারও দিকে আসে, তখন তাকে পরীক্ষা করে; আর যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন কষ্ট দেয়। যখন ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন তা নষ্ট হয়ে যায়; যখন প্রশস্ত হয়, তখন দংশন করে; আর যখন আনন্দ দেয়, তখনই দুঃখ দেয়। কবি বলেছেন, ‘দুনিয়ার অবস্থা হলো কখনো ক্ষমতার পালা, কখনো দুরবস্থা; আর জীবন হলো কখনো সুস্থতা, কখনো অসুস্থতা।’ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলো, পার্থিব ভোগ সামান্য আর যে মুত্তাকি তার জন্য পরকালই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হবে না।’ (সুরা নিসা : ৭৭)

পরহেজগার ও আল্লাহভীরু মানুষ আল্লাহর নেয়ামতে আনন্দিত হয়। তারা সেই আনন্দ কৃতজ্ঞতা, স্মরণ ও প্রশংসার মাধ্যমে প্রকাশ করে। তারা সম্পদ পেয়ে অহংকারী হয় না, ধনসম্পদে মত্ত হয় না। সুখে তারা বাড়াবাড়ি করে না, দুঃখে হতাশ হয় না। কিন্তু যারা বিলাসী ও অপব্যয়ী তারা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতে গর্ব করে, মানুষের সঙ্গে দাম্ভিকতা দেখায়। তাদের অভ্যাসই হলো অহংকার, দম্ভ ও বড়াই করা। তারা পোশাক-পরিচ্ছদে, বাহারি জিনিসে, পশু-সম্পদে ও সন্তান সংখ্যায় প্রতিযোগিতা করে। নিজেদের স্তরের লোকদের ছোট মনে করে, গরিবদের ওপর প্রাধান্য দেখায় ও দুর্বলদের হৃদয় ভেঙে দেয়। এটাই গর্ব ও অহংকারে ভরা মানুষের স্বভাব এবং জ্ঞান ও বিবেকহীন লোকদের বৈশিষ্ট্য, যারা অভাবীদের অনুভূতি বোঝে না, বিপদগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুতদের কষ্টে মনোযোগ দেয় না, অসুস্থ ও দুঃখীদের অবস্থার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না।
আরও পড়ুন

অহংকার, আত্মতুষ্টি, দুনিয়ার প্রেমে ডুবে যাওয়া, তার চাকচিক্যে প্রতারিত হওয়া, নিজের বড়ত্বে ভেসে যাওয়া ও অন্যদের হেয় ভাবা- এসবই মানুষকে বিপথে নেয়। তারা খ্যাতি ও প্রদর্শন ভালোবাসে, আনন্দে নয়, বরং গর্বে মত্ত হয়। এমন কাজ শুধু সেই হৃদয় থেকেই আসে যা অহংকার, অজ্ঞতা ও অন্যায়ে ভরে গেছে এবং বিনয় ও নম্রতা সেখান থেকে হারিয়ে গেছে। ফলে সে গাফেল হয়ে পড়ে, ভুলের মধ্যে পড়ে যায়, নাক উঁচু করে চলে, নিজেকে বড় মনে করে, মানুষকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখে, দম্ভভরে হাঁটে ও কথা বলে। শয়তান তাদের মনে একরকম দম্ভের আগুন জ্বেলে দেয়। এতে তারা সাময়িক উত্তেজনা ও আনন্দ পায়, যা তাদের অপচয় ও বেহিসাবি খরচে ঠেলে দেয়। তারা হারাম কাজে ব্যয় করে, শুধু নাম-যশ ও লোক দেখানোর জন্য সম্পদ নষ্ট করে, প্রতিযোগিতা ও গর্বে অর্থ নষ্ট করে ফেলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব, ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছু নয়।’ (সুরা হাদিদ : ২০)

ইসলামের দৃষ্টিতে অহংকার বা কিবর মূলত এমন একটি মানসিক বিকৃতি, যেখানে মানুষ নিজেকে অন্যের চেয়ে উচ্চে দেখতে চায়, আল্লাহর নির্দেশনা ও মানুষের অধিকারকে তুচ্ছ মনে করে এবং নিজের ভেতরকার দুর্বলতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। এই ব্যাধি আত্মার স্বাভাবিক বিনয়কে ধ্বংস করে দেয়, যা একজন মুমিনের ঈমান, চরিত্র ও আচার-আচরণের ভিত্তি। কুরআন অহংকারকে শুধু নিষিদ্ধ করেনি, বরং এটি এমন একটি নৈতিক বিকৃতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে যা মানুষকে আল্লাহর দয়া ও হেদায়েত থেকে বঞ্চিত করে। কুরআন অহংকারকে সরাসরি হৃদয়ের রোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। সুরা আন-নাহলের ব্যাখ্যায় আমরা দেখি, আল্লাহ কখনো অহংকারীদের ভালোবাসেন না, কারণ অহংকার মানুষের হৃদয়কে এমনভাবে কঠিন করে তোলে যে তা আর আল্লাহর নৈকট্যের যোগ্য থাকে না। (সুরা আন-নাহল : ২৩)

প্রতিটি মানুষের মধ্যে দুটি শক্তি লুকায়িত থাকে। একটি ফেরেশতার চরিত্র বা ইতিবাচক গুণাবলি আর দ্বিতীয়টি হলো শয়তানি চরিত্র বা মন্দ স্বভাব। নেতিবাচক সেই স্বভাবের একটি হলো অহংকার। মানবের মনোজগৎ তথা চরিত্রের ছয়টি শত্রু রয়েছে, যা ষড়‌রিপু নামে পরিচিত- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য। এই ষড়রিপুর পঞ্চমটি হলো ‘মদ’ তথা দম্ভ, গর্ব, গৌরব, অহংকার। আর ষষ্ঠটি হলো ‘মাৎসর্য’ তথা ঈর্ষা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা। অহংকার শয়তানের চরিত্র। এই অহংকার ও হিংসাই ইবলিসকে ফেরেশতাদের শিক্ষক থেকে শয়তানে পরিণত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সে (ইবলিস সম্মানিত আদমকে সেজদার মাধ্যমে সম্মান করতে) অস্বীকার করল এবং অহংকার করল, পরিণতিতে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত : ৩৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিনটি বস্তু মানবের ধ্বংসের কারণ- প্রবৃত্তি বা নফসের পূজা, লোভ ও আত্ম-অহংকার। তিনি আরও বলেন, ‘অহংকারই হলো সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতিকারক’ (বায়হাকি, মিশকাত : ৫১২২)। আত্মগৌরব করা শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যে ব্যক্তি এ গুণ নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে টানাটানি করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন; তার প্রভাব, প্রতাপ, প্রতিপত্তি নস্যাৎ করে দেন এবং তার জীবনকে সংকুচিত করে দেন। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারককে প্রশ্ন করা হলো, অহংকার কাকে বলে? তিনি বললেন, মানুষকে হেয় জ্ঞান করা (সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা : ৪০৭)। কেন মানুষ অহংকার করে? আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষ অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করে, যখন সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।’ (সুরা আলাক, আয়াত : ৬-৭)

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। পদচারণে মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো, নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর (সুরা লুকমান, আয়াত : ১৮-১৯)। অহংকারীদের পরিণতি সম্পর্কে রাসুলে আকরাম (সা.) বলেন, ‘অহংকারী ব্যক্তিরা কেয়ামতের দিন উঠবে মানুষের রূপে পিঁপড়াসদৃশ ক্ষুদ্রাকৃতিতে। সর্বত্র লাঞ্ছনা তাদের বেষ্টন করে রাখবে। অতঃপর তাদের বুলাস নামক জাহান্নামের এক কারাগারের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। যেখানে লেলিহান অগ্নি তাদের ঢেকে ফেলবে। সেখানে তারা জাহান্নামিদের পোড়া দেহের গলিত পুঁজ-রক্তে পূর্ণ তিনাতুল খাবাল নামক নদী থেকে গরল পান করবে।’ (তিরমিজি : ১৮৬২)

অহংকার শুধু একটি চরিত্রগত ত্রুটি নয়, এটি ধ্বংসের সূচনা। আখেরাতের জন্য এটি ভয়াবহ এবং দুনিয়ার জীবনেও এটি সম্পর্ক, শান্তি, সম্মান সবকিছু নষ্ট করে দেয়। একজন বিশ্বাসীর কর্তব্য হলো নিজের অন্তরকে অহংকারের গোপন ফাঁদ থেকে রক্ষা করা, আর আল্লাহর সামনে নিজের সামান্যতা ও দুর্বলতাকে বারবার স্মরণ করা। কারণ সত্যিকারের সম্মান, মর্যাদা এবং সফলতা শুধু তাদের জন্যই, যারা বিনয়, কৃতজ্ঞতা এবং আল্লাহমুখী জীবনের ওপর স্থির থাকে।

এএডি/


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: