ইলিয়াছ মিয়ার নিঃসঙ্গ মৃত্যু

নরসিংদী প্রতিনিধি

সারাদেশ

নরসিংদী জেলা হাসপাতালের একটি নির্জন বেডে সাত দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন এক অচেনা মানুষ। নাম-পরিচয়হীন সেই মানুষটির পাশে

2026-05-16T11:35:50+00:00
2026-05-16T16:34:58+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
ইলিয়াছ মিয়ার নিঃসঙ্গ মৃত্যু
নরসিংদী প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম  আপডেট: ১৬.০৫.২০২৬ ৪:৩৪ পিএম
প্রতীকী ছবি
নরসিংদী জেলা হাসপাতালের একটি নির্জন বেডে সাত দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন এক অচেনা মানুষ। নাম-পরিচয়হীন সেই মানুষটির পাশে ছিল শুধু হাসপাতালের সাদা দেয়াল, স্যালাইনের ফোঁটা আর কর্তব্যরত কয়েকজন চিকিৎসক-নার্সের মানবিক দায়িত্ববোধ। কেউ জানতো না তিনি কে, কোথা থেকে এসেছেন, কিংবা তার জন্য কোনো মানুষ অপেক্ষা করছে কি না।

অবশেষে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর নড়ে ওঠে প্রশাসন। পরিচয় শনাক্তে কাজ শুরু করে পিবিআই নরসিংদী। মাত্র এক দিনের মধ্যেই মিলল পরিচয়— তিনি নরসিংদী সদর উপজেলার ব্রাহ্মণপাড়া এলাকার ইলিয়াছ মিয়া। বাবা জামাল মিয়া, মা রহিমা বেগম। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি যেন তখনও অপেক্ষা করছিল।

পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পাঁচ ঘণ্টা পর, শুক্রবার (১৫ মে) দিবাগত রাত ২টার দিকে হাসপাতালের বেডেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ইলিয়াছ মিয়া। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পরিবারের কেউ তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। কেউ কপালে হাত রাখেনি, কেউ বলেনি—ভয় পেও না, আমরা আছি।


একজন মানুষ জীবনের শেষ সাত দিন অজ্ঞাত হিসেবে পড়ে থাকলেন। পরিচয় ফিরে পেলেন, কিন্তু আপনজনের স্পর্শ পেলেন না।

মৃত্যুর একদিন পর শনিবার সকালে হাসপাতালে এসে হাজির হন পরিবারের সদস্যরা। তখন ইলিয়াছ মিয়া আর কোনো অভিযোগ করার অবস্থায় নেই। হাসপাতালের মর্গের নিথর দেহ নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে ছিল। হয়তো সেই নীরবতাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজের সামনে—মানুষ কি এখন শুধু বেঁচে থাকলেই আপন, অসহায় হয়ে পড়লে আর কেউ নয়?

আজকের ব্যস্ত নগরজীবনে আত্মীয়তার বন্ধনগুলো যেন ধীরে ধীরে পর হয়ে যাচ্ছে। বৃদ্ধ বাবা-মা, অসুস্থ স্বজন কিংবা হারিয়ে যাওয়া মানুষ—অনেকেই পরিবার থাকা সত্ত্বেও একাকিত্বের শিকার হচ্ছেন। প্রযুক্তি মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব যেন আরও বাড়িয়েছে।

ইলিয়াছ মিয়ার মৃত্যু কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা, পারিবারিক সম্পর্ক ও মানবিক মূল্যবোধের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। একজন অসহায় মানুষ হাসপাতালের বেডে পড়ে ছিলেন, অথচ শেষ মুহূর্তে তার সবচেয়ে প্রয়োজন ছিল আপনজনের উপস্থিতি।

হাসপাতালের একজন কর্মচারী আক্ষেপ করে বলেন, লোকটা বারবার অস্পষ্টভাবে কিছু বলতে চাইতেন। মনে হতো কারও খোঁজ করছেন। কিন্তু সেই খোঁজ আর পূরণ হলো না।

সমাজে মানবতা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি বলেই সংবাদ প্রকাশের পর পরিচয় খুঁজে বের করতে এগিয়ে এসেছে প্রশাসন, চিকিৎসক ও গণমাধ্যম। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়— যে পরিবার একজন মানুষকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে নেয় না, মৃত্যুর পরে তাদের কান্না কতটা সত্যিকারের?

ইলিয়াছ মিয়ার নিঃসঙ্গ মৃত্যু হয়ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অর্থ বা সম্পদ নয়, প্রয়োজন একটু খোঁজ নেওয়া, একটু পাশে দাঁড়ানো, একটু মানবতা।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   মানবতা  অসহায়  পরিচয় মিলল  মানুষ  নরসিংদী 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: