টুং-টং শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে মেহেরপুরের কামারশালাগুলো। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কাজের চাপে কামারদের যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। সারা বছর তেমন কাজ না থাকলেও কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এখন দিন-রাত চলছে ব্যস্ততা। পাইকারি দোকানে নতুন তৈরি করা সরঞ্জাম সরবরাহ করার পাশাপাশি পশুর চামড়া ছাড়ানো ও মাংস কাটার পারিবারিক ছুরি-চাপাতি তৈরি ও শান দিতেই সময় পার করছেন কারিগররা। গ্রামাঞ্চল ও শহরের কামার পরিবারগুলো মূলত বছরের এই একটি মৌসুমের জন্যই চাতক পাখির মতো দিন গোনে।
বর্তমানে মেহেরপুর শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড পাড়া, ক্যাশবপাড়া, গাংনী বাজার, বামন্দি বাজার, ষোলটাকা, ধানখোলা বাজার ও হেমায়েতপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কামারশালাগুলোতে কারিগরদের বিরতিহীনভাবে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে কোরবানিদাতারা পশু জবাইয়ের জন্য ছুরি, চাপাতি, দা, বটিসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী শান দেওয়া এবং নতুন জিনিস কেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। আর এই সুযোগে কামাররাও পুরো বছরের মন্দা ভাব পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বছরজুড়ে অলস সময় পার করলেও এখন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে দা, ছুরি ও চাপাতি তৈরি এবং শান দেওয়ার কাজ। কাজের চাপ এতটাই বেশি যে, অনেকেই ইতোমধ্যে নতুন কাজের অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এই ব্যস্ততম সময়ে অনেক বাজারে মৌসুমভিত্তিক কামারদেরও কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। বছরের অন্য সময়ে কাজ না থাকায় জেলার যে-সব কামার পেশা বদলে অন্য কাজে যোগ দিয়েছিলেন, তারাও এই ঈদে বাড়তি আয়ের আশায় পুরোনো পেশায় ফিরে এসেছেন।
ধানখোলা গ্রামের ইদ্রিস কামার জানান, তিনি দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। আগে সারা বছর কৃষিকাজে ব্যবহৃত হাসুয়া, নিড়ানি, কাস্তে, কোদাল ও কুড়াল তৈরি ও শান দেওয়ার কাজ করতেন। তবে বর্তমানে ধান-গম মাড়াই এবং গাছ কাটার আধুনিক সব মেশিন চলে আসায় তাদের সনাতন কাজের চাহিদা অনেক কমে গেছে। এখন কেবল এই এক ঈদ মৌসুমেই যা একটু কেনাবেচার ধুম পড়ে। এই মৌসুমের আয় আর বছরের অন্য সময়ের ছোটোখাটো কাজ মিলিয়েই তাদের সংসার চালাতে হয়। তিনি জানান, ছোট ছুরি থেকে শুরু করে বড় ছুরি ও চাপাতিতে শান দেওয়ার জন্য আকারভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
কামার শিল্পে দীর্ঘ ৩৫ বছরেরও বেশি সময় পার করা সিদ্দিক হোসেন কিছুটা আক্ষেপের সুরে বলেন, এক সময় আমাদের হাতের কাজের খুব কদর ছিল, যা এখন আর নেই। বাজারে এখন আধুনিক মেশিনের সাহায্যে তৈরি চকচকে যন্ত্রপাতি পাওয়া যাচ্ছে, যার ফলে আমাদের তৈরি করা জিনিসের প্রতি মানুষ আকর্ষণ হারাচ্ছে। হয়ত একসময় এই পেশাটিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে কোরবানির ঈদের এই সময়টাতে ব্যস্ততা অনেক বাড়ে এবং রোজগারও ভালো হয়।
মেহেরপুরের স্থানীয় বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কামারদের তৈরি বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে। তবে আকার ও ওজনভেদে এর দামের ভিন্নতা রয়েছে, দা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা। ছোট ছুরি ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকা। বড় ছুরি ২৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা। অন্যান্য নতুন ধারালো অস্ত্র ৫৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত।
কারিগরেরা জানান, বাজারে কয়লা, লোহা ও ইস্পাতের দাম আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের তৈরি করা নতুন অস্ত্রের দামও এবার কিছুটা বেশি রাখতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে নানা সংকটের মাঝেও মেহেরপুরের কামারশালাগুলোতে এখন ঈদের আগাম আমেজ ও কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে।
সময়ের আলো/জোই