ভারতের রাজস্থানের যোধপুরে পুলিশের চরম নিষ্ক্রিয়তা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা গণধর্ষণ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়ে দুই বোনের আত্মহত্যার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত মার্চ মাসে বড় বোনের আত্মহত্যার পর, সম্প্রতি তার ছোট বোনও বিচার না পেয়ে বিষপান করে আত্মহত্যা করেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর গাফিলতি এবং অভিযুক্তদের আড়াল করার অভিযোগ তুলেছে নিহতের পরিবার ও স্থানীয় জনতা।
চার বছর ধরে ব্ল্যাকমেইল ও প্রথম আত্মহত্যা
পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত প্রায় চার বছর আগে। স্থানীয় একটি 'ই-মিত্র' সার্ভিস সেন্টারের অপারেটর মহিপাল গোপনে বড় বোনের কিছু আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে। এরপর সেই ভিডিওর সূত্র ধরে মহিপাল ও তার সহযোগীরা দীর্ঘ চার বছর ধরে ওই তরুণীকে গণধর্ষণ করে এবং সামাজিক মর্যাদার ভয় দেখিয়ে লাগাতার অর্থ আদায় করতে থাকে।
অসহ্য মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গত ২০ মার্চ বড় বোন আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনার পর গত ১১ এপ্রিল নিহতের ছোট বোন পুলিশে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এফআইআরে মহিপাল, শিবরাজ, গোপাল, বিজারাম, দীনেশ, মনোজ এবং পুখরাজসহ মোট আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারী বোন আগেই পুলিশকে সতর্ক করেছিলেন যে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তিনিও আত্মহননের পথ বেছে নেবেন।
বিচারহীনতা ও ছোট বোনের ওপর নির্যাতন
বড় বোনের মৃত্যুর পর এফআইআর দায়ের হলেও গত এক মাসে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান বা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। উল্টো বড় বোনের মৃত্যুর পর অভিযুক্তরা ছোট বোনকে টার্গেট করে। বড় বোনের সেই ভিডিওগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ছোট বোনকেও ধর্ষণ করা শুরু করে তারা।
নিহত তরুণী মৃত্যুর আগে অভিযোগ করেছিলেন, মামলা করার পরও অভিযুক্তরা তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছিল এবং অহংকার করে বলছিল যে পুলিশ তাদের কিছুই করতে পারবে না। গত শুক্রবার (১৫ মে) নিজের আকুতি প্রশাসনের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে ওই তরুণী একটি পানির ট্যাংকের ওপর উঠে পড়েন এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবি জানান। পরবর্তীতে তিনি বিষপান করেন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
গণবিক্ষোভ ও পরিবারের দাবি
দুই বোনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পর যোধপুরের গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মারওয়ার রাজপুত সোসাইটিসহ স্থানীয় রাজপুত সম্প্রদায়ের মানুষ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য এমডিএম হাসপাতালের মর্গে রাখা হলে সেখানে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
মারওয়ার রাজপুত সোসাইটির সভাপতি হনুমান সিং খাংটা অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই পুলিশ প্রশাসন আসামিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। পুলিশের এই চরম অবহেলা ও ব্যর্থতার কারণেই আজ দুটি প্রাণ অকালে ঝরে গেল। নিহতের বাবাও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
প্রশাসনের আশ্বাস ও বর্তমান পরিস্থিতি
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যোধপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) পিডি নিত্য জানিয়েছেন, মূল অভিযুক্ত মহিপালসহ দুজনকে এরইমধ্যে আটক করা হয়েছে এবং তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া চলছে। বাকি আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খোঁজা হচ্ছে।
একই সাথে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, পুরো ঘটনার তদন্তে অবহেলাকারী ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা হবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের এই আশ্বাসের পর নিহতের পরিবার ময়নাতদন্তের জন্য সম্মতি প্রদান করেছে। বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
/ইউএমএইচ