নেপালের বরফঢাকা পর্বতমালায় আট হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতার দুর্গম পর্বত 'মাউন্ট মাকালু' জয়ের রোমাঞ্চকর ও হাড়হিম করা গল্প শোনালেন ডা. বাবর আলী। তিনি জানান, ক্যারিয়ারে এর আগে বেশ কয়েকটি আটহাজারি পর্বত জয় করলেও মাকালুর মতো তীব্র ঠান্ডা আর ঝোড়ো হাওয়ার মুখোমুখি তাকে কোথাও হতে হয়নি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাকালুতে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই ছিল চরম অগ্নিপরীক্ষা।
রোববার (১৭ মে) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশবাসীকে এই অভিযানের বিস্তারিত জানান বাবর আলী।
দেশে ফেরা উপলক্ষে ‘এক্সপিডিশন মাকালু : দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলন ও পতাকা প্রত্যর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অভিযানের আয়োজক পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’।
অনুষ্ঠানে পর্বতারোহী বাবর আলী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মূল পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান 'ভিজুয়াল নিটওয়্যার লিমিটেড'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নুর ফয়সাল।
পৃথিবীতে আট হাজার মিটারের চেয়ে বেশি উচ্চতার পর্বত রয়েছে মাত্র ১৪টি। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এর মধ্যে ৪টি পর্বতের চূড়ায় পা রেখেছিলেন বাবর আলী, যা আর কোনো বাংলাদেশির নেই। গত ২ মে বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে তিনি পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু (৮,৪৮৫ মিটার বা ২৭,৮৩৮ ফুট) স্পর্শ করে নিজের পঞ্চম আটহাজারি জয়ের রেকর্ড গড়েন। নেপালের মহালঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত এই পর্বত জয়ে এটিই কোনো বাংলাদেশির প্রথম সফলতা।
অভিযানের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বাবর আলীর কণ্ঠে ছিল প্রিয় বন্ধুদের হারানোর বেদনা। তিনি বলেন, মাকালু আবহাওয়ার দিক থেকে অত্যন্ত রহস্যময় ও বিপজ্জনক। এখানে মুহূর্তের মধ্যে আবহাওয়া বদলে যায়। এই অভিযানেই আমি আমার আমেরিকান বন্ধু শেলি জোহানসেনকে হারিয়েছি। চূড়া জয় করে নেমে আসার পথে তুষারধসে পড়ে শেলি প্রাণ হারায়। এছাড়া আমার আরেক রাশিয়ান বন্ধু কন্সট্যান্টিন তুষারক্ষতের (ফ্রস্টবাইট) শিকার হয়ে হাত ও পায়ের বেশ কয়েকটি আঙুল হারিয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, লাল-সবুজ পতাকা হাতে বিজয়ের আনন্দ যেমন আছে, তেমনি বন্ধুদের এই দুর্ঘটনাগুলো মনের ভেতর অসম্ভব খারাপ লাগা তৈরি করেছে। পর্বত মাঝে মাঝেই বড্ড অন্যায্য আচরণ করে।
বাবর আলী জানান, এ বছর তার মূল পরিকল্পনা ছিল কারাকোরাম হিমালয়ে অবস্থিত বিশ্বের নবম উচ্চতম শৃঙ্গ 'নাঙ্গা পর্বত' আরোহণের। কিন্তু প্রয়োজনীয় স্পনসরশিপ ও অর্থসংকটের কারণে শেষ মুহূর্তে তিনি লক্ষ্য পরিবর্তন করে 'গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান' বা 'মহা-কালো' খ্যাত মাউন্ট মাকালুকে বেছে নেন।
নিজের ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা জানিয়ে বাবর বলেন, বিশ্বের ১৪টি আটহাজারি শৃঙ্গের সবকটিতেই বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়াতে চাই। সবেমাত্র ৫টি হলো, বাকি আছে আরও ৯টি। পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাকিগুলোও জয় করতে পারব। তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, পর্বতারোহণ কোনো খেয়ালি বিষয় বা দিবাস্বপ্ন নয়, এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সাধনা ও কঠোর প্রস্তুতি।
৭ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা। ৯ এপ্রিল বিমানে টুমলিংটার হয়ে গাড়িতে সেদুয়া গ্রামে পৌঁছানো এবং সেখান থেকে ট্রেকিং শুরু। ১৭ এপ্রিল মাকালুর উচ্চতর বেসক্যাম্পে আগমন। ২১-২৭ এপ্রিল উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ক্যাম্প-১ ও ক্যাম্প-২ (৭ হাজার মিটার) ওপরে ওঠা এবং নামা। ৩০ এপ্রিল চূড়ান্ত আরোহণের লক্ষ্যে বেসক্যাম্প থেকে সরাসরি ৬,৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২ এ পৌঁছানো। ১ মে ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩ এ পৌঁছানো এবং মাঝরাতে চূড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা। ২ মে ভোর ৫টা ৪৫ টানা ১ হাজার ১০০ মিটারেরও বেশি খাড়া ও ভয়ানক পথ পাড়ি দিয়ে মাকালু জয় এবং একই দিনে নিরাপদে বেসক্যাম্পে প্রত্যাবর্তন।
পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ম্যানেজার ইমতিয়াজ ইবনে ইমাম জানান, সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এই অভিযানে সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেড সম্পৃক্ত হয়েছে। এছাড়া চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, মাই হেলথ ও রহমান গ্রোসারিজও এই দুঃসাহসিক অভিযানে সহযোগিতা করেছে।
ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের সভাপতি ফরহান জামান বলেন, বিশ্বের পঞ্চম শীর্ষ পর্বত মাকালুতে বাবরের সৌজন্যে উড়ল আমাদের লাল-সবুজ পতাকা। জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্য বিশাল গর্বের। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাবর এই স্পোর্টসের মাধ্যমে দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে।
২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে বাবরের পথচলা শুরু। পেশায় চিকিৎসক বাবর আলী ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক। ২০১৭ সালে ভারতের উত্তরকাশীর নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হিমালয়ের অন্যতম দুর্গম ও টেকনিক্যাল চূড়া 'আমা দাবলাম' (২২,৩৪৯ ফুট) আরোহণ করেন। এরপর ২০২৪ সালের মে মাসে একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে আরোহণ করে ইতিহাস গড়েন তিনি।
সময়ের আলো/জোই