হামাসের শীর্ষ কমান্ডার আল-হাদ্দাদ নিহত : কী প্রভাব পড়তে পারে গাজার যুদ্ধে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

হামাসের সামরিক শাখা কাসসাম ব্রিগেডের সদ্য নিযুক্ত প্রধান ইজ আল-দীন আল-হাদ্দাদ নিহত হওয়াকে গাজার চলমান যুদ্ধে একটি বড় প্রতীকী ধাক্কা

2026-05-17T21:52:22+00:00
2026-05-17T21:52:22+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
হামাসের শীর্ষ কমান্ডার আল-হাদ্দাদ নিহত : কী প্রভাব পড়তে পারে গাজার যুদ্ধে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ৯:৫২ পিএম 
হামাসের সামরিক শাখা কাসসাম ব্রিগেডের সদ্য নিযুক্ত প্রধান ইজ আল-দীন আল-হাদ্দাদ। ছবি : আল-জাজিরা
হামাসের সামরিক শাখা কাসসাম ব্রিগেডের সদ্য নিযুক্ত প্রধান ইজ আল-দীন আল-হাদ্দাদ নিহত হওয়াকে গাজার চলমান যুদ্ধে একটি বড় প্রতীকী ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে হামাসের সামরিক কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়বে— এমনটা নিশ্চিত নয়।

শুক্রবার (১৫ মে) গাজা সিটির রেমাল এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলের দ্বৈত হামলায় আল-হাদ্দাদ নিহত হন। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ আরও সাত ফিলিস্তিনি নিহত এবং অন্তত ৫০ জন আহত হন। এলাকাটি বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষের ভিড়ে অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ছিল।

ইসরায়েল দাবি করেছে, এই হত্যাকাণ্ড হামাসের সামরিক সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে দুর্বল করবে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, হামাসের কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে শীর্ষ নেতৃত্ব হারালেও সংগঠনটি দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে।

আল-হাদ্দাদ হামাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতা হিসেবে উঠে আসেন মোহাম্মদ দেইফ, মারওয়ান ইসা এবং ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ভাই মোহাম্মদসহ একাধিক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ার পর। তিনি গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন।

ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাঈদ জিয়াদ আল জাজিরাকে বলেন, এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘বড় প্রতীকী ও মানসিক আঘাত’, তবে হামাসের সশস্ত্র শাখার ওপর এর তাৎক্ষণিক সামরিক প্রভাব সীমিত হতে পারে।

তার ভাষায়, কাসসাম ব্রিগেড প্রচলিত সামরিক বাহিনীর মতো পুরোপুরি কেন্দ্রীয় বা ধারাবাহিক কমান্ড কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং এটি বিকেন্দ্রীভূত গেরিলা কাঠামোতে পরিচালিত হয়, যেখানে বিভিন্ন ইউনিট অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

তিনি বলেন, গত দুই দশকে হামাস নিজেদের এমনভাবে সংগঠিত করেছে যাতে প্রতিটি ইউনিটের নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা, যুদ্ধ কৌশল এবং অপারেশন পরিচালনার সক্ষমতা থাকে। ফলে কোনো ব্রিগেড বা ব্যাটালিয়নের কমান্ডার নিহত হলেও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো তাদের মিশন চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, হামাসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নতুন কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠন করতে খুব বেশি সময় নাও নিতে পারে। তাদের ধারণা, কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।

এদিকে আল-হাদ্দাদের হত্যাকাণ্ড গাজায় চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই হামলা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং হামাসের ওপর রাজনৈতিক ও মানসিক চাপ তৈরির কৌশলের অংশও হতে পারে।

বিশ্লেষক সাঈদ জিয়াদের মতে, আল-হাদ্দাদ শুধু সামরিক অভিযান পরিচালনাই করেননি, বরং ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির সময়টাকে ব্যবহার করে হামাসের সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজও এগিয়ে নিয়েছিলেন।

জিয়াদ বলেন, ‘গত প্রায় ২০০ দিনে তিনি প্রতিরোধ বাহিনীর সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছেন। টানেল নেটওয়ার্ক, অস্ত্রভান্ডার এবং যুদ্ধ কাঠামো আবার গড়ে তুলেছেন, যাতে সংগঠনটি পুনরায় নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়।’

হামাসের সামরিক নেতৃত্বে এখন কারা আছেন 

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তারা হামাসের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড প্রায় ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার আগে যে সামরিক কাউন্সিল ছিল, সেখানকার মাত্র দুজন সদস্য—মোহাম্মদ আওয়াদ ও ইমাদ আকেল—এখনও জীবিত আছেন।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, হামাসের সামরিক কাঠামো অনেক গভীর ও সংগঠিত। যুদ্ধ শুরুর আগে কাসসাম ব্রিগেডে প্রায় ৫০ হাজার যোদ্ধা ছিল এবং সংগঠনটির নেতৃত্বের বিকল্প প্রস্তুত রাখার একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা রয়েছে।

সাঈদ জিয়াদ বলেন, ‘প্রতিরোধ সংগঠনগুলো সাধারণত প্রতিটি সক্রিয় কমান্ডারের জন্য প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের বিকল্প প্রতিনিধি নির্ধারণ করে রাখে—জেনারেল কমান্ডার থেকে শুরু করে প্লাটুন নেতা পর্যন্ত। ফলে কোনো শূন্যতা তৈরি হলেও তা দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হয়।’

হামাস দ্রুতই আল-হাদ্দাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। সংগঠনটির মুখপাত্র হাজেম কাসেম আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে কাসসাম ব্রিগেডের ‘জেনারেল কমান্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করে শোক প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, আল-হাদ্দাদের মৃত্যু ‘বড় ধরনের ক্ষতি’, তবে এর পরও সংগঠনটির ‘প্রতিরোধের দীর্ঘ যাত্রা অব্যাহত থাকবে’।


কাসসাম ব্রিগেডের ‘ভূত’

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে জন্ম নেওয়া ইজ আল-দীন আল-হাদ্দাদ হামাস প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৭ সালেই সংগঠনটিতে যোগ দেন। সময়ের সঙ্গে তিনি একজন সাধারণ পদাতিক যোদ্ধা থেকে হামাসের গাজা সিটি ব্রিগেডের কমান্ডারে পরিণত হন। তার অধীনে ছয়টি ব্যাটালিয়ন ছিল, যেখানে প্রতিটি ব্যাটালিয়নে প্রায় এক হাজার যোদ্ধা এবং চার হাজার সহায়ক সদস্য কাজ করত।

আল-হাদ্দাদ হামাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইউনিট ‘আল-মাজদ’ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই ইউনিটের কাজ ছিল ইসরায়েলের হয়ে তথ্য সরবরাহকারী সন্দেহভাজন সহযোগীদের শনাক্ত করা।

তবে তার সবচেয়ে আলোচিত পরিচয় হয়ে ওঠে বারবার হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়ার কারণে। ২০০৯, ২০১২ ও ২০২১ সালে তার বাড়িতে ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়। এছাড়া গাজায় চলমান যুদ্ধের সময়ও তাকে লক্ষ্য করে অন্তত তিনবার হামলার চেষ্টা হয়। প্রতিবারই তিনি বেঁচে যান। এ কারণেই হামাসের ভেতরে তিনি ‘ভূত’ নামে পরিচিতি পান।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামলার পরিকল্পনায় আল-হাদ্দাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত বেড়া ভাঙার অভিযান তদারকি করেন এবং রেইম সামরিক ঘাঁটি ও ফাজ্জা ফাঁড়িতে হামলা চালানো বিশেষ ইউনিটগুলোকেও নির্দেশনা দেন।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের কয়েক ঘণ্টা আগে আল-হাদ্দাদ স্থানীয় কমান্ডারদের হাতে একটি লিখিত নির্দেশনা দেন, যেখানে হামলার পরিকল্পনা এবং ইসরায়েলি সেনাদের আটক করার নির্দেশনা ছিল।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার ছেলে সুহাইব নিহত হন। তবে সেই হামলাতেও আল-হাদ্দাদ বেঁচে যান এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বন্দিদের আটকের তদারকি চালিয়ে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভঙ্গুর ‘যুদ্ধবিরতি’র প্রান্তে গাজা

শুক্রবার ইজ আল-দীন আল-হাদ্দাদ নিহত হওয়ার পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক যৌথ বিবৃতি দেন। সেখানে তারা দাবি করেন, তাদের সরাসরি নির্দেশেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

ইসরায়েলি বিষয়ক বিশ্লেষক মোহান্নাদ মুস্তফার মতে, আল-হাদ্দাদকে হত্যার মাধ্যমে ইসরায়েল গাজায় চলমান ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি লঙ্ঘনকে ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ করে তুলতে চাইছে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহু ও কাটজের যৌথ বিবৃতিকে তিনি ওয়াশিংটনের কাছে ভবিষ্যতেও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজায় অন্তত ৮৭১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুস্তফা বলেন, ‘নেতানিয়াহু মার্কিন প্রশাসনের কাছে এই হত্যাকাণ্ডকে হামাসকে “নিরস্ত্র” করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল কখনোই এই যুদ্ধবিরতি চায়নি। এটি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’

তার মতে, ইসরায়েল সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট কারণ না দেখিয়েই বেসামরিক মানুষ, পুলিশ সদস্য ও সামরিক কর্মকর্তাদের টার্গেট করছে, যাতে হামাসকে প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করা যায়।

মুস্তফা বলেন, ‘চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে হামাসকে পাল্টা হামলায় উসকে দেওয়া। তাহলে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাবে এবং ইসরায়েল “গিদিওন ২” নামে একটি নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার অজুহাত পাবে।’ তার দাবি, এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো পুরো গাজা উপত্যকার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

অন্যদিকে বিশ্লেষক সাঈদ জিয়াদের মতে, নেতানিয়াহু সরকার এখনও হামাসের ‘পূর্ণ আত্মসমর্পণ’-এর মতো কোনো সুস্পষ্ট কৌশলগত বিজয় দেখাতে পারেনি। ফলে ইসরায়েলি নেতৃত্ব এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমর্থকদের সামনে ‘বিজয়ের ছবি’ তুলে ধরতে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের ওপর বেশি নির্ভর করছে।

তবে ইতিহাস বলছে, হামাসের মতো সশস্ত্র ফিলিস্তিনি সংগঠনের ক্ষেত্রে শীর্ষ সামরিক নেতাদের হত্যা দীর্ঘমেয়াদে খুব কমই বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

জিয়াদ বলেন, ‘গাজার যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের কাছে এসব হত্যাকাণ্ড এক ধরনের রক্তের চুক্তিতে পরিণত হয়। এটি তাদের পিছু হটায় না, বরং আরও কঠোর অবস্থানে নিয়ে যায়।’

তার ভাষায়, ‘দেইফ, সিনওয়ার বা হাদ্দাদের মতো নেতাদের হারানোর পর লড়াই ছেড়ে দেওয়া তাদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয়।’


সূত্র : আল-জাজিরা 

/ইউএমএইচ







  বিষয়:   হামাস  গাজা  আল-হাদ্দাদ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: