নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ‘নব জাগরণ শ্রমজীবী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে একটি সমবায় সমিতির (এনজিও) বিরুদ্ধে ঋণ প্রদানের নামে সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ঋণের টাকা সুদসহ সম্পূর্ণ পরিশোধ করার পরও এনজিওটির অসৎ কর্মকর্তারা জামানত হিসেবে রাখা গ্রাহকদের স্বাক্ষর করা খালি চেক ফেরত না দিয়ে, উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
রোববার (১৭ মে) প্রতারকদের বিচার চেয়ে আক্তার হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী রূপগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালের ১৪ মে নারায়ণগঞ্জ জেলা সমবায় কার্যালয় থেকে ‘নব জাগরণ শ্রমজীবী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে একটি এনজিওর নিবন্ধন (নিবন্ধন নং- ১৫০) নেন রূপগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণবাগ ও গোয়ালপাড়া এলাকার কয়েকজন যুবক। এনজিওটির তৎকালীন পরিচালনা কমিটিতে সভাপতি পদে আতিকুল ইসলাম, সহ-সভাপতি পদে মো. রুহুল আমিন, সম্পাদক পদে মামুন ভুঁইয়া, যুগ্ম সম্পাদক পদে মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, কোষাধ্যক্ষ পদে সুশীল চন্দ্র সরকার এবং সদস্য হিসেবে সোনা মিয়া ভুঁইয়া দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
এনজিওটি থেকে ঋণ নেওয়ার মূল শর্তই ছিল—জামানত হিসেবে গ্রাহকের নিজের নামীয় ও স্বাক্ষরিত ব্যাংকের খালি চেক জমা দিতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহকরা সুদসহ মাসিক কিস্তিতে ঋণের টাকা পরিশোধ করতেন এবং টাকা পরিশোধ হলে জামানতের চেক ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ঋণ পরিশোধের পর এনজিও কর্তৃপক্ষ চেক ফেরত না দিয়ে, তাদের নিজস্ব লোকজন দিয়ে চেকে মোটা অঙ্কের টাকা বসিয়ে ‘চেক ডিজঅনার’ করিয়ে আদালতে সিআর (CR) মামলা ঠুকে দেয়। এরপর মামলা তুলে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী আক্তার হোসেন জানান, ২০১৭ সালের ২২ মে যমুনা ব্যাংকের কাঞ্চন বাজার শাখার দুটি খালি চেক (নং A0189439 ও A0189440) জমা রেখে ২ লাখ টাকা ঋণ নেন। পরবর্তীতে তিনি যথাসময়ে সুদসহ সব টাকা পরিশোধ করেন। এরপর ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কয়েকবার ঋণ নিয়ে তা সফলভাবে শোধ করেন। তবে ঋণের টাকা পরিশোধের পর জামানতের চেক ফেরত চাইলে এনজিওর সভাপতি আতিকুল ইসলাম ‘দিচ্ছি-দেব’ বলে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। পরবর্তীতে আতিকুল ইসলামের নিয়োজিত লোক দিয়ে ওই খালি চেকে ৩ লাখ টাকা পাওনা দাবি করে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মিথ্যা মামলা (সিআর মামলা নং- ৩৬৮/২০২৪) করা হয়। অপর চেকটিও এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। এই প্রতারণার বিচার চেয়ে রূপগঞ্জ থানাসহ সরকারি বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দিয়েছেন আক্তার হোসেন।
ভুক্তভোগী ফিরোজা বেগম জানান, ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) একটি খালি চেক (নং 1084405) জামানত রেখে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন। তিনি ১২ কিস্তিতে সুদসহ পুরো টাকা পরিশোধ করেন। ২০১৯ সালেও তিনি পুনরায় ঋণ নেন এবং তা যথাসময়ে শোধ করেন। কিন্তু তার চেকটি ফেরত না দিয়ে, ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর এনজিওর নিয়োজিত দক্ষিণবাগ এলাকার মাজহারুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে দিয়ে চেক ডিজঅনারের নাটক সাজানো হয়। এরপর ৩ লাখ টাকা দাবি করে নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা (১০৭৯/২০২৪) করে তার পুরো পরিবারকে হয়রানি করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী মোতালিব মিয়া জানান, ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেডের কাঞ্চন বাজার শাখার একটি খালি চেক (নং MSA- 2496628) জামানত রেখে ঋণ নেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে সুদসহ সব টাকা শোধ করেন। কিন্তু এনজিও কর্তৃপক্ষ চেক ফেরত না দিয়ে উল্টো ২ লাখ টাকা পাওনা দাবি করে তাদের ভাড়াটে লোক দিয়ে চেক ডিজঅনার করায় এবং ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ আদালতের মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠায়। পরবর্তীতে দাবিকৃত টাকা না দেওয়ায় আদালতে সিআর মামলা দায়ের করা হয়।
এই প্রতারণার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ‘নব জাগরণ শ্রমজীবী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’-এর সভাপতি আতিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন বলেন, প্রতারকরা বিভিন্ন কৌশলে সাধারণ মানুষকে ঠকায়। ঘটনাটির বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই