সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো— এটি একই সঙ্গে ইতিহাস, মানুষ, প্রেম ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে পারে। সেই শক্তির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে তাইওয়ানের লেখক ইয়াং শুয়াং-জির উপন্যাস ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’। ভ্রমণ, খাবার, ঔপনিবেশিক শাসন ও দুই নারীর সম্পর্কের সূক্ষ্ম বয়ানে নির্মিত এই উপন্যাস এবার জিতে নিয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মান ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কার।
এই প্রথম মান্দারিন চীনা ভাষা থেকে অনূদিত কোনও উপন্যাস এ পুরস্কার অর্জন করল। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন তাইওয়ানিজ-আমেরিকান অনুবাদক লিন কিং। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই জয় শুধু একটি সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি নয়, বরং তাইওয়ানের ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও নতুন করে পরিচয়।
উপন্যাসের পটভূমি ১৯৩০-এর দশকের তাইওয়ান। সে সময় দ্বীপটি ছিল জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন জাপানি লেখক আওয়ামা চিজুকো, যিনি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাইওয়ান সফরে আসেন। তার সঙ্গে থাকেন তাইওয়ানিজ অনুবাদক চিজুরু। শুরুতে তাদের সম্পর্ক ছিল কেবল ভ্রমণসঙ্গীর, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ধীরে ধীরে গভীর প্রেমে রূপ নেয়।
তারা একসঙ্গে ঘুরে বেড়ান তাইওয়ানের নানা অঞ্চল। স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেন, মানুষের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখেন, অনুভব করেন সংস্কৃতির ভেতরের অদৃশ্য বিভাজন। এই খাদ্যভ্রমণই উপন্যাসটির প্রাণ। এখানে খাবার শুধু খাবার নয়— এটি স্মৃতি, পরিচয়, শ্রেণি ও ক্ষমতারও ভাষা।
বইটির বিশেষত্ব হলো এর নির্মাণশৈলী। পুরো উপন্যাসটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যেন বহু বছর পর খুঁজে পাওয়া কোনও পুরনো ভ্রমণদিনলিপির অনুবাদ এটি। কল্পিত ফুটনোট, তথ্যসূত্র ও নথিপত্রের ব্যবহারে বইটি এতটাই বাস্তব মনে হয় যে, প্রকাশের পর অনেক পাঠক এটিকে সত্যিকারের ঐতিহাসিক দলিল ভেবেছিলেন।
তবে তাইওয়ান ট্রাভেলগ কেবল প্রেমের গল্প নয়। এর ভেতরে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের জটিল বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, পরিচয়ের সংকট এবং প্রান্তিক মানুষের অনুভূতি। জাপানি শাসনের সময়কার তাইওয়ানের মানুষ কীভাবে আনন্দ, প্রেম ও হাসির জায়গা খুঁজে নিয়েছিল— সেই মানবিক দিকটিও অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উঠে এসেছে উপন্যাসে।
অনুবাদক লিন কিং এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘কঠিন সময়েও মানুষ হাসতে চায়, ভালোবাসতে চায়।’ তার মতে, কোনও জাতির ইতিহাসকে শুধু ট্র্যাজেডির ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখলে তার জীবনের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। এই উপন্যাস সেই পূর্ণতাকেই তুলে ধরেছে।
লেখক ইয়াং শুয়াং-জিও বেশ রসিকতার সঙ্গে বলেছেন, ‘ভ্রমণ ও খাবার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তার সঞ্চয় কমেছে এবং ওজন বেড়েছে।’ কিন্তু সেই গবেষণার ফলেই জন্ম নিয়েছে এমন এক সাহিত্যকর্ম, যা পাঠককে একই সঙ্গে ক্ষুধার্ত, আবেগপ্রবণ ও চিন্তিত করে তোলে।
মাত্র ৪১ বছর বয়সী ইয়াং শুয়াং-জি শুধু ঔপন্যাসিক নন; তিনি প্রবন্ধ, কমিকস এবং ভিডিও গেমের চিত্রনাট্যও লেখেন। তাইওয়ান ট্রাভেলগ এর আগে তাইওয়ানের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ‘গোল্ডেন ট্রাইপড অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছিল। পরে এর ইংরেজি অনুবাদও জিতে নেয় ‘ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেটেড লিটারেচার’।
এবার আন্তর্জাতিক বুকার জয় সেই সাফল্যকে বিশ্বমঞ্চে আরও উজ্জ্বল করে তুলল। একই সঙ্গে আবারও প্রমাণ হলো— ভাষা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু প্রেম, খাবার আর মানুষের গল্প সব দেশেই সমানভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
/মহু