নদীতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও বরিশালের পাইকারি মাছের মোকামগুলোতে দেখা দিয়েছে ইলিশের তীব্র সংকট। বাজারে অল্প পরিমাণ মাছ এলেও দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এতে ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও ক্রেতা, সবাই পড়েছেন বিপাকে।
বরিশালের পোর্ট রোড মাছের মোকামে আগে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ মন ইলিশ আসত। এখন সেখানে ৫০ মন মাছও মিলছে না। ফলে একসময় ভোর থেকেই জমজমাট থাকা মোকাম এখন অনেকটাই নিরব।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নদীতে মাছ কমে যাওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। তারা বলছেন, ছোট জাল দিয়ে জাটকা নিধন ও নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে ইলিশের উৎপাদন কমেছে।
এছাড়া সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় যে মাছ ধরা পড়ছে, তার বড় অংশ সরাসরি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। এতে বরিশালের মোকামে সরবরাহ কমে গেছে।
পোর্ট রোডের ব্যবসায়ী আক্তার হোসেন বলেন, গত ১৮ বছরে এমন পরিস্থিতি তিনি দেখেননি। আগে প্রতিটি বোর্ডে ১০০ থেকে ১৫০ মন মাছ আসত, এখন মাছই পাওয়া যায় না। এতে মোকামের প্রায় ১৬০ জন ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
আরেক ব্যবসায়ী ইয়ার হোসেন বলেন, ‘নদীতে ইলিশ নেই বললেই চলে। ব্যবসা নামমাত্র চলছে। আগে যে পরিমাণ মাছ থাকত, এখন তার অল্প অংশও পাওয়া যায় না।’
ইলিশের সংকটে আয় কমে গেছে শ্রমিকদেরও। আগে মৌসুমে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা আয় হলেও এখন অনেক শ্রমিক দিনে ১০০ থেকে ১৫০ টাকাও পাচ্ছেন না।
সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে বেড়েছে ইলিশের দাম। ১ কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি মন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়, ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মন ১ লাখ টাকা, ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মন ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা এবং ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মন ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা
এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, ইলিশ এখন ‘আনুষ্ঠানিক’ মাছ হয়ে গেছে।
ক্রেতা আমিনুল বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও যে মাছ ৮০০ টাকায় কিনেছি, এখন ১২০০ টাকা কেজি। বাজারে মনিটরিং না থাকায় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দাম বাড়াচ্ছে।’
আরেক ক্রেতা লিটন শিকদার বলেন, ‘ছোট জাটকাও অনেক দামে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে ইলিশ কেনা এখন প্রায় অসম্ভব।’
পোর্ট রোড মৎস্য আড়ৎদার মালিক সমিতির সভাপতি কামাল শিকদার জানান, মেঘনা, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জসহ বিভিন্ন নদীতে চর জেগে ওঠায় ইলিশ ধরা কমে গেছে। পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় মাছ বরিশালে না এসে দেশের অন্য বাজারে চলে যাচ্ছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘এবার ইলিশের পরিমাণ তুলনামূলক কম। নদীতে চর পড়াও একটি কারণ হতে পারে। তবে ইলিশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান চলছে।’
তিনি জানান, জেলায় এ পর্যন্ত ৪১টি মোবাইল কোর্ট ও ৩১৭টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে ৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা এবং অবৈধ জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, নিয়ন্ত্রণহীন জাটকা নিধন ও নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় ইলিশের এই সংকট তৈরি হয়েছে। তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ চান।
/এসএকে