বছর ঘুরে আবারও আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগ ও উৎসর্গের এক অনন্য মহিমাময় উৎসব। এই দিনে মুসলিম উম্মাহ আনন্দে উদ্বেলিত হলেও এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা নিছক আনন্দের নয়; বরং এটি আত্মত্যাগ, আল্লাহভীতি ও নিঃশর্ত আনুগত্যের এক গভীর বার্তা বহন করে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ এই দিনে ব্যস্ত সময় কাটায়। ঈদের নামাজ আদায়, কুরবানির পশু জবাই এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকে। ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ উৎসব এবং ‘আজহা’ শব্দের অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ। আর ‘কুরবানি’ শব্দটি এসেছে ‘কুরবুন’ থেকে, যার অর্থ নৈকট্য বা সান্নিধ্য লাভ করা। অর্থাৎ কুরবানি হলো এমন এক ইবাদত, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে। ইসলামি পরিভাষায় ‘উজহিয়্যা’ বলা হয় সেই পশুকে, যা নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জবাই করা হয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির বিধান নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহ প্রদত্ত চতুষ্পদ জন্তুর ওপর তাঁর নাম উচ্চারণ করে’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩৪)। এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, কুরবানি কেবল মুসলিম উম্মাহর জন্য নয়, বরং পূর্ববর্তী নবীদের যুগ থেকেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে প্রচলিত।
মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কুরবানির ঘটনা ঘটে হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে। আল্লাহর নির্দেশে তারা উভয়েই কুরবানি পেশ করেন। হাবিল একটি উত্তম পশু কুরবানি করেন, আর কাবিল নিম্নমানের শস্য। আল্লাহ হাবিলের কুরবানি কবুল করেন, কিন্তু কাবিলেরটি প্রত্যাখ্যান করেন। এতে কাবিল হিংসায় জ্বলে ওঠে এবং হাবিলকে হত্যা করার হুমকি দেয়। উত্তরে হাবিল বলেন, ‘আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ২৭)। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়- কুরবানির মূল বিষয় ‘বস্তু’ নয়, বরং নিয়ত ও তাকওয়া।
কুরবানির ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ও তাৎপর্যময় অধ্যায় হলো হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর ঘটনা। আল্লাহ তায়ালা স্বপ্নের মাধ্যমে ইবরাহিম (আ.)-কে নির্দেশ দেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানি করতে। প্রথমে তিনি নিজের সম্পদ দান করেন, পরে বহু পশু কুরবানি করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করেন, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় হলো তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)। আল্লাহর নির্দেশ পালনে তিনি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন। পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে মিনা প্রান্তরের উদ্দেশে রওনা দেন। পথে শয়তান বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে মা হাজেরা (আ.), ইসমাইল (আ.) এবং ইবরাহিম (আ.) সবাইকেই প্রলুব্ধ করতে চায়। কিন্তু তারা কেউই শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হননি। আজও হজের সময় ‘রামি জামারাত’ বা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে সেই ঘটনার স্মরণ করা হয়। অবশেষে ইবরাহিম (আ.) তাঁর পুত্রকে বলেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি তোমাকে কুরবানি করছি; এখন তুমি বলো, তোমার মত কী?’ জবাবে ইসমাইল (আ.) বলেন, ‘হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’ (সুরা সাফফাত, আয়াত : ১০২)। এরপর পিতা-পুত্র উভয়ে আল্লাহর আদেশ পালনে প্রস্তুত হন। ইসমাইল (আ.) নিজেই কুরবানির জন্য নিজেকে সমর্পণ করেন। কিন্তু যখন ইবরাহিম (আ.) তাঁর গলায় ছুরি চালাতে উদ্যত হন, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানির জন্য প্রেরণ করা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এটি ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা এবং আমি তাঁকে এক মহান কুরবানির বিনিময়ে মুক্তি দিয়েছি।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত : ১০৬-১০৭)
এই ঘটনাই কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা, আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এবং সর্বোচ্চ ত্যাগের মানসিকতা। কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করেন, আমরা কি সত্যিই তাঁর জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত? কুরবানির ফজিলত সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে বহু বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ো এবং কুরবানি করো’ (সুরা আল-কাউসার, আয়াত : ২)। অন্যত্র বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত বা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩৭)। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি বছর কুরবানি করেছেন এবং তিনি বলেছেন, ‘কুরবানির দিনে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কাজ আল্লাহর কাছে আর কিছু নেই’ (তিরমিজি)। তিনি আরও বলেন, ‘এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নাহ’ (ইবনে মাজাহ)। অতএব কুরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ঈমান, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার এক বাস্তব প্রকাশ। আমাদের উচিত বাহ্যিক আয়োজনের পাশাপাশি অন্তরের তাকওয়া অর্জনে সচেষ্ট হওয়া।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে প্রকৃত অর্থে কুরবানির চেতনা ধারণ করে তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়ার তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/জেডআই