পাবনার ভাঙ্গুড়ায় বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের প্রায় সাড়ে তিন একর মূল্যবান সরকারি জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই পাট ক্রয়কেন্দ্রের অধিকাংশ জায়গা এখন স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা।
ভাঙ্গুড়া উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামে অবস্থিত সরকারি পাট ক্রয়কেন্দ্রটি বর্তমানে এমন অবস্থায় রয়েছে যে, এটি একসময় কৃষকদের পাট বিক্রির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল তা বোঝার উপায় নেই। ভাঙ্গুড়া রেলস্টেশন সংলগ্ন ফুটবল মাঠের পাশে অবস্থিত বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের এই আঞ্চলিক পাট ক্রয়কেন্দ্র একসময় চলনবিল অঞ্চলের পাটচাষিদের পদচারণায় মুখর থাকত।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে থেমে যায় কেন্দ্রটির কার্যক্রম। দীর্ঘদিন তদারকির অভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা এই সরকারি সম্পত্তি এখন অবৈধ দখলদারদের কবলে। আগে সচল থাকা প্রতিষ্ঠানের বড় বড় টিনশেড ঘর ও মূল্যবান যন্ত্রাংশের অধিকাংশই চুরি কিংবা বিক্রি হয়ে গেছে। বর্তমানে কিছু পুরোনো ঘর ও যন্ত্রাংশ কেবল অতীতের স্মৃতি বহন করছে।
গত এক দশকে পাট ক্রয়কেন্দ্রের জমিতে গড়ে উঠেছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবন, স্কুল, মাদ্রাসা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি সরকারি জমি বিক্রিও করা হয়েছে।
সরেজমিনে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে বসবাসকারী অনেক দখলদার দ্রুত ঘরে তালা ঝুলিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন সরকারের এক এমপি ও তার পুত্রের ছত্রছায়ায় অনেকেই এখানে বসতি ও স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান থেকে লিজ নেওয়া ব্যক্তি সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে জায়গা বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশন থেকে কেন্দ্রটির ২ দশমিক ১৯ একর জমি বৈধ প্রক্রিয়ায় ভাড়া নেন বিএম গোলজার হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তবে তার বিরুদ্ধে শর্ত ভঙ্গ করে বিজেসির মূল্যবান যন্ত্রপাতি বিক্রি এবং স্থাপনায় সাব-ভাড়াটিয়া বসানোর অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সেখানে বড় বড় টিনশেড ঘর ও লোহার যন্ত্রাংশ ছিল। বিগত সরকারের সময় থেকেই একটি চক্র গোপনে জমি বিক্রি করে আসছে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমি বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে বিজেসির কিছু দায়িত্বশীল কর্মকর্তারও যোগসাজশ রয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিজেসির পাট ক্রয়কেন্দ্রের লিজগ্রহীতা বিএম গোলজার হোসেন। তিনি বলেন, বৈধ প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তিনি লিজ নিয়েছেন। দেশের অন্যান্য বন্ধ পাট ক্রয়কেন্দ্রের মতো এটিও তিনি খামার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর আগে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই কেন্দ্রটি লিজ নিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, কোনো যন্ত্রাংশ বা সম্পদ বিক্রি করা হয়নি।
এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে সরকারি জমি দখলের সত্যতা পাওয়া গেছে। অনেকেই সরকারি জমিতে পাকা বহুতল ভবন ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। দখলদারদের তালিকা তৈরি করে জুট কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তারা চাইলে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।
বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজের রহমান মাকছিম বলেন, অবৈধ দখলের বিষয়টি সত্য। দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। তবে কেন্দ্রটি বর্তমানে লিজ দেওয়া রয়েছে। মাঝে মধ্যে পরিদর্শন করা হলেও সম্পদ বিক্রির বিষয়টি তাদের জানা নেই বলে জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয় পাটচাষিরা পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ভাঙ্গুড়া পাট ক্রয়কেন্দ্রটি দখলমুক্ত করে পুনরায় চালু এবং সেখানে আধুনিক পাট সংরক্ষণাগার নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
আরবিএন