আবাদি জমিতে ‘চাষ’ হচ্ছে সৌর বিদ্যুৎ, হুমকিতে কৃষকের জীবিকা

মুস্তাফিজুর রহমান, পাবনা

সারাদেশ

তিন ফসলি কৃষি জমিকে অকৃষি ও পরিত্যক্ত দেখিয়ে ইজারা নিয়ে (সোলার পার্ক) বিদ্যুৎ প্রকল্প করায় জমি ও বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব

2026-05-21T17:34:40+00:00
2026-05-21T18:20:30+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
আবাদি জমিতে ‘চাষ’ হচ্ছে সৌর বিদ্যুৎ, হুমকিতে কৃষকের জীবিকা
মুস্তাফিজুর রহমান, পাবনা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৫:৩৪ পিএম  আপডেট: ২১.০৫.২০২৬ ৬:২০ পিএম
সোলার পার্ক। ছবি : সময়ের আলো
তিন ফসলি কৃষি জমিকে অকৃষি ও পরিত্যক্ত দেখিয়ে ইজারা নিয়ে (সোলার পার্ক) বিদ্যুৎ প্রকল্প করায় জমি ও বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে পাবনার সুজানগরের রামাকান্তপুর গ্রামের কয়েক হাজার কৃষক। অধিকার আদায়ে প্রতিবাদ করায় জেলও খেটেছেন অনেকেই। ক্ষতিপূরণের কথা বলে দফায় দফায় উৎকোচও নিয়েছে সরকারি কর্মচারীসহ একটি প্রতারকচক্র।

পাবনা সুজানগর উপজেলার সাগরকান্দি ইউনিয়নের পদ্মা নদীর তীরবর্তী বিশাল কৃষি প্রধান অঞ্চল রামাকান্তপুর গ্রাম। এই গ্রামেই (বাংলাদেশ-চায়না) যৌথ মালিকানাধীন রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি লিমিটেড (বিসিআরইসিএল) ৬৪ মেঃওঃ সোলার পার্ক স্থাপন করেছে। আর এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে সরকারি খাস খতিয়ান থেকে। জমির ধরন দেখানো হয় অকৃষি জমি। কিন্তু বাস্তবতা হলো দীর্ঘ বছর পূর্বে নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া এই জমি জেগে উঠায় হাজারো কৃষক বংশ পরম্পরায় জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।

২০২১ সালে এ চরের তিন ফসলি প্রায় ২০৬ একর জমিকে অকৃষি দেখিয়ে এখানে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করে প্রভাবশালীরা। জমি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিপূরণের কথা বলে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয় তাদের। ফলে রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে যায় তারা। পুরো প্রকল্প এলাকার চারপাশে কৃষি জমি এখনো দৃশ্যমান। ধান থেকে শুরু করে এমন কোনো ফসল নেই যা আবাদ হয় না এখানকার ফসলের ক্ষেতে। বছরে তিনটি ফসল উৎপাদন হয় এই জমি থেকে।

জমিগুলো খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় চতুর প্রভাবশালীরা জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা নিলে বন্ধ হয়ে যায় ক্ষতিপূরণের পথ। এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে মামলা দিয়ে জেলও খাটানো হয় অনেককেই। একদিকে আবাদি জমি হারিয়ে বিপাকে কৃষক, অন্যদিকে প্রভাবশালীদের দেয়া হয়রানিমূলক মামলায় নাজেহাল হচ্ছেন তারা। প্রথম থেকেই জেলা-উপজেলা প্রশাসনের দারস্থ হয়েও রক্ষা করতে পারেননি তাদের ফসলি জমি। তাইতো এখনো সরকার ও প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।

পাখির চোখে ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য দেখে বোঝা যায়, নিয়ম না মেনেই কৃষি জমিতেই স্থাপন করা হয়েছে সোলার পার্কটি। এদিকে ক্ষতিপূরণ এবং অধিগ্রহণের টাকা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে অসহায় এসব মানুষের কাছ থেকে কয়েক দফা টাকা নিয়েছে কিছু অসাধু সরকারি কর্মচারীসহ একটি জালিয়াত চক্র। অনেকেই ভিটেমাটি, গবাদি পশু বিক্রি করে সেই টাকা দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি তাদের।

এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি রামাকান্তপুর ৬৪ মেগাওয়াট সোলার পার্ক কর্তৃপক্ষ। তবে মুঠোফোনে দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়ম মেনেই এখানে সোলার পার্ক স্থাপন হয়েছে। চুক্তি অনুসারে এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হয়েছে গত বছরের আগস্ট মাস থেকে।

ভুক্তভোগী কৃষকেরা জমির ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসনের দাবিতে সোলার পার্কের মূল ফটকের সামনে বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবি, পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া কৃষি জমি তাদের আয়ের অন্যতম মাধ্যম। সরকার ও প্রশাসন কেমন করে জরিপ করলো কৃষি জমিকে অকৃষি দেখিয়ে সোলার পার্ক স্থাপন করলো এই প্রশ্ন তুলেছেন তারা। নদীর ভাঙনের ফলে জমি নদীগর্ভে চলে যায়, আবার চর পড়ে জেগে উঠে জমি।

বিগত সরকারের সময়ে বিচারহীনতার সুযোগে ক্ষমতায় থাকা প্রভাবশালীরা কোটি কোটি টাকা আয় করেছে এই জমি দখল করে দিয়ে। আমরা গ্রামের অসহায় সাধারণ কৃষক, আমরা আমাদের জমির ক্ষতিপূরণ চাই। তা না হলে এই সোলার পার্ক বন্ধ করে দিবো আমরা।

পাবনা জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, জমিতে তাদের মালিকানা না থাকায় জমির দাম বা ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না সরকার বা প্রশাসনের। তবে বিষয়টি নিয়ে আমার কাছে তারা কোনো আবেদন করেনি। তবু বিষয়টি তদন্ত করে সেখানে খাস খতিয়ানভুক্ত কোনো কৃষি জমি থাকলে তাদের বরাদ্দের মাধ্যমে পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন তিনি।

সম্প্রতি জমির ক্ষতিপূরণ দাবিতে বিদ্যুৎ প্রকল্প ঘেরাও এবং মানববন্ধন করে এ গ্রামের ভূমিহীন কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ, বিগত সরকারের দুইজন প্রভাবশালী এমপির সহায়তায় তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

১৯৮.৭১ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ১৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের চুক্তি অনুসারে। ২০২৫ সালের আগস্ট মাস থেকে এই সোলার পার্কের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের মানুষ উপকার ভোগ করছেন। অন্যদিকে তিন ফসলি জমিতে সোলার পার্ক স্থাপনের ফলে ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। তাই কৃষকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ সরকারি খাস জমি বন্দোবস্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

আরবিএন 


  বিষয়:   সোলার পার্ক  বিদ্যুৎ প্রকল্প  পাবনা  সুজানগর  রামাকান্তপুর 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: