কালো টাকা সাদা করার সুযোগে মেলে না প্রত্যাশিত ফল

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বরাবরই বিতর্কিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। বিভিন্ন

2026-05-21T20:39:53+00:00
2026-05-21T20:39:53+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
অর্থনীতি
কালো টাকা সাদা করার সুযোগে মেলে না প্রত্যাশিত ফল
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৮:৩৯ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বরাবরই বিতর্কিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে সরকার এ ধরনের সুযোগ দিলেও পরিসংখ্যান বলছে, এতে প্রত্যাশিত সুফল খুব একটা মেলেনি। বরং করনীতির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হওয়া, সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করা এবং বৈষম্য তৈরির অভিযোগ বারবার উঠেছে। 

তবুও জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও বাণিজ্যিক স্পেস কেনাবেচায় প্রকৃত লেনদেন গোপন এবং কম মূল্যে দলিল করার প্রবণতার কারণে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হওয়ায় আগামী বাজেটে নতুন করে সীমিত সুযোগ দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রিয়েল এস্টেট খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার একটি শর্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে এটিকে সরাসরি ‘কালো টাকা সাদা’ না বলে, বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট অপ্রদর্শিত অর্থ মূলধারায় আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে সরকার।

বর্তমানে জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচায় প্রকৃত মূল্য গোপন করে মৌজা মূল্যে দলিল করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। উদাহরণ হিসেবে, কোনো ফ্ল্যাটের প্রকৃত বিক্রয়মূল্য যদি দুই কোটি টাকা হয়, কিন্তু মৌজা রেট অনুযায়ী দলিল হয় ৬৫ লাখ টাকায়, তাহলে বাকি এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা কার্যত অপ্রদর্শিত থেকে যায়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এই অর্থ বৈধ করতে হলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই আয়কর রিটার্নে সম্পদের প্রকৃত মূল্য দেখাতে হবে। এরপর প্রচলিত করহারে কর পরিশোধের মাধ্যমে ওই অর্থ বৈধ করা যাবে।

এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই এই অপ্রদর্শিত অর্থের সৃষ্টি হয়। যতদিন মৌজা মূল্য ও প্রকৃত বাজারমূল্যের বড় ব্যবধান থাকবে, ততদিন এই সমস্যা চলতেই থাকবে। তাই শর্তসাপেক্ষে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার একাধিকবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া পাওয়া যায় করোনা মহামারির সময়ে, ২০২০-২১ অর্থবছরে। সে সময় ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলেও ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈধ করেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয় প্রায় ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।

তবে পরের অর্থবছরেই সুযোগ কিছুটা সীমিত করা হলে আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে মাত্র ২ হাজার ৩১১ জন করদাতা প্রায় এক হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা বৈধ করেন। এর আগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল। তখন ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা নিয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে মোট প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা বৈধ করা হয়, যার বড় অংশ আসে ২০২০-২১ অর্থবছরে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে এ সুবিধা আবার চালু করা হয়েছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধীরে ধীরে বিশেষ দায়মুক্তির সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়।

বর্তমানে বিদ্যমান আইনে যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অপ্রদর্শিত অর্থ আয়কর নথিতে দেখাতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ করের পাশাপাশি করের ওপর আরও ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়।

অর্থনীতিবিদরা বরাবরই কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুবিধার বিরোধিতা করে আসছেন। তাদের মতে, এতে সাময়িকভাবে কিছু রাজস্ব এলেও দীর্ঘমেয়াদে কর সংস্কৃতির ক্ষতি হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এ ধরনের সুযোগ সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং কর ব্যবস্থায় বৈষম্য সৃষ্টি করে।

তিনি বলেন, যারা নিয়মিত কর দেন, তারা এমন সুবিধাকে ভালো চোখে দেখেন না। এতে করনীতির প্রতি আস্থা কমে যায়। একান্তই সুযোগ দিতে হলে নিয়মিত করহারের পাশাপাশি জরিমানাও রাখা উচিত।

এদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান সম্প্রতি প্রাক-বাজেট আলোচনায় বলেন, আলাদা কোনো বিশেষ স্কিম ছাড়াই বিদ্যমান করহার অনুযায়ী কর দিয়ে যে কেউ অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করতে পারেন। অতীতে দেওয়া বিশেষ সুবিধাগুলো প্রত্যাশিত ফল দেয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


তার ভাষায়, ‘বিগত ৫৪-৫৫ বছরে অনেক বিশেষ স্কিম দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলো হিতে বিপরীত হয়েছে। এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন।’

অন্যদিকে, আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা এখনো অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা চান। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) চলতি বছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় আবারও ফ্ল্যাট কেনায় অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন না তোলার বিধান পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, এতে আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে খাতটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

তবে বাস্তবতা হলো, বারবার সুযোগ দেওয়ার পরও কালো টাকা সাদা করার উদ্যোগ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। বরং এটি কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   কালো টাকা  সাদা  সুযোগ  বাজেট 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: