নোয়াখালীর হাতিয়ায় অভিনব কৌশলে গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ৫৩ লাখ টাকার গরু নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। কয়েক দফায় বিশ্বাস অর্জনের পর শেষ পর্যন্ত মোটা অঙ্কের গরু বাকিতে নিয়ে টালবাহানা শুরু করে চক্রটি। পরে কৌশলে দুই সদস্যকে আটক করলে তারা উল্টো ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে পুলিশের সহযোগিতা চান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুইজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২১ মে) হাতিয়া থানায় মো. আবুল কালাম নামে এক গরু ব্যবসায়ী বাদী হয়ে আটক দুজনসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। পরে পুলিশ তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
আটক দুজন হলেন নোয়াখালী সদর উপজেলার এজবালিয়া ইউনিয়নের মৃত ফারুক হোসেনের ছেলে মো. বেলাল হোসেন এবং নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার মিজমিজি এলাকার মজিবুর রহমানের ছেলে মো. রিপন। এ মামলার মূলহোতা হিসেবে কামাল হোসেন নামে আরও একজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ মে কামাল হোসেনসহ এই দুই ব্যক্তি হাতিয়া বাজারে গরু কিনতে আসেন। তারা নিজেদের ঢাকা সেনানিবাসে গরুর মাংস সরবরাহকারী বলে পরিচয় দেন। প্রথম দিন তারা একটি ট্রাক ভর্তি গরু কিনে নিয়ে যান। এরপর ১৬ মে আবারও হাতিয়া বাজারে এসে দুই ট্রাক গরু ক্রয় করেন।
ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জনের জন্য তারা কিছু গরু বাকিতে নিয়ে গেলেও পরদিন ব্যাংকের মাধ্যমে সেই টাকা পরিশোধ করে দেয়। এতে ব্যবসায়ীদের সন্দেহ দূর হয়ে যায় এবং চক্রটির প্রতি বিশ্বাস তৈরি হয়।
এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা হাতিয়ার সাতজন গরু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ৫২ লাখ ৫৭ হাজার টাকার গরু বাকিতে নিয়ে যায়। প্রতিশ্রুতি দেয়, পরদিন ব্যাংকের মাধ্যমে পুরো টাকা পরিশোধ করা হবে। কিন্তু পরদিন সকাল থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে।
একপর্যায়ে ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেন, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তখন কৌশলে অন্য ব্যাপারির মাধ্যমে আরও গরু দেওয়ার কথা বলে অভিযুক্তদের আবার হাতিয়া বাজারে ডেকে আনা হয়। সেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাদের দুই সদস্যকে আটক করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত আটক দুই ব্যক্তি নানা কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শেষ পর্যন্ত তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চান। পরে পুলিশ এসে তাদের থানায় নিয়ে যায়।
মামলার বাদী গরু ব্যবসায়ী মো. আবুল কালাম বলেন, পুরো ঘটনাটি ছিল সুপরিকল্পিত প্রতারণা। প্রথমে অল্প কিছু গরু বাকিতে নিয়ে টাকা পরিশোধ করে তারা আমাদের বিশ্বাস অর্জন করে। পরে বড় অঙ্কের গরু নিয়ে উধাও হওয়ার চেষ্টা করে। তারা সেনানিবাসে মাংস সরবরাহের কথা বলায় আমরা তাদের বিশ্বাস করেছিলাম।
তিনি আরও বলেন, আমি সহ সাতজন ব্যবসায়ীর মোট ৫২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে। আমরা সবাই এখন চরম বিপদে আছি। হাতিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে গরু কিনে এনে হাতিয়া বাজারে বিক্রি করা হয়। এই বাজারটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গরুর বাজার হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এখানে আসেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে হাতিয়া বাজারে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা গরু কিনতে আসেন। ফলে বড় অঙ্কের লেনদেন হওয়ায় প্রতারক চক্রগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠছে। এ ধরনের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, প্রতারক চক্রের দুই সদস্য বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ মামলার মূলহোতা কামাল হোসেন এখনো পলাতক। তার বাড়ি সোনাইমুড়ি এলাকায়। তিনি একজন চিহ্নিত প্রতারক এবং তার বিরুদ্ধে প্রতারণার একাধিক মামলা রয়েছে। পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আরবিএন