সেবা প্রদান হলো একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, ভূমি সেবা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এখন থেকে সেবা প্রোভাইডারদের (কর্মকর্তা-কর্মচারী) গতিবিধি মনিটরিং করা হবে বলে জানান, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এমপি।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ৩ দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা ২০২৬’-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।
মীর মো.হেলাল উদ্দীন জানান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বারবার সচেতন করার পর এখন মাঠপর্যায়ে জনসেবা ঠিকমতো নিশ্চিত হচ্ছে কী না, তা দেখার সময় এসেছে। এজন্য ‘ভূমি দৃষ্টি’ নামে একটি বিশেষ ড্যাশবোর্ড ও অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে, যা ভূমি সেবা প্রদানকারীদের গতিবিধি মনিটরিং করবে। এটি ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
তিনি অ্যাপটির কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি শুরু হবে। এর মাধ্যমে দায়িত্বশীল সেবকদের ট্র্যাকিং সিস্টেমের আওতায় আনা হবে। আমরা অফিসগুলোর কার্যাবলীকে জিও-লোকেটরি স্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যখনই তার জিও-লোকেটরি মোবাইল ফোন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্ম এলাকায় প্রবেশ করবেন, অ্যাপটিতে সবুজ সংকেত জ্বলবে। আবার কর্ম এলাকা ত্যাগ করলে লাল বাতি জ্বলে উঠবে। এর মাধ্যমে অফিসে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও সেবা প্রদানের মান নিখুঁতভাবে মনিটরিং করা যাবে। এই পদ্ধতি সফল হলে সরকারের অন্যান্য সেক্টরেও এটি চালুর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সর্বাত্মক চেষ্টা হচ্ছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। আমরা প্রান্তিক পর্যায় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে দ্রুত জনসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছি।
তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কৃষি জমি, বনের জমি ও জলাশয়—কোনো সম্পদকেই বিনষ্ট হতে দেওয়া হবে না। ‘ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং’ পদ্ধতিতে স্ব-স্ব জোন নির্ধারণ করে এসব সম্পদ সুরক্ষা করা হচ্ছে। এই ল্যান্ড জোনিংয়ের মাধ্যমেই রিজার্ভ ফরেস্টগুলো বেদখল হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। এছাড়া ভূমি সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা কমিয়ে আনার জন্যও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল জোর দিয়ে বলেন, গুটি কয়েক দুষ্টু ও অনৈতিক লোকের কারণে পুরো ভূমি ব্যবস্থাপনাকে বদনামের সম্মুখীন হতে দেওয়া হবে না। শুধু আইন প্রয়োগ করে মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন সম্ভব নয়, এজন্য আমাদের চিন্তাধারার মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে।
অনলাইন সেবা ও ডিজিটালাইজেশন
ব্যারিস্টার মীর হেলাল জানান, বর্তমানে দেশের ১৯৩টি ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ নামমাত্র ফি দিয়ে অনলাইন ভূমিসেবা গ্রহণ করছেন। অধিকাংশ লেনদেন ইতোমধ্যে ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। সেবা সহজীকরণ এবং দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
এবারের ভূমিসেবা মেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল, ‘জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা, সুরক্ষিত ভূমি, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’। অনুষ্ঠান শেষে প্রতিমন্ত্রী ১০ জন ভূমিহীন পরিবারের মাঝে কৃষিখাসজমি বন্দোবস্তের কবুলিয়ত ও সেবা প্রত্যাশীদের হাতে খতিয়ান তুলে দেন। পাশাপাশি মেলা উপলক্ষে আয়োজিত কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার ও সনদপত্র বিতরণ করেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে এবং বাকলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিফাত বিনতে আরার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত সিএমপি কমিশনার মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাখাওয়াত জামিল সৈকত। সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত ৩ দিনব্যাপী এই মেলায় মোট ১২টি স্টলের মাধ্যমে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে ভূমি বিষয়ক আবৃত্তি ও ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা পরিবেশন করা হয়।
সময়ের আলো/জোই