মুসলমানদের সামনে এখন কুরবানির হাতছানি। সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন কুরবানির। কেউ কুরবানির পশু বিক্রি করবে, কেউ ক্রয় করবে, কেউ কাজ করবে- কোনো না কোনোভাবে সবাই অংশগ্রহণ করবে কুরবানির বিপুল কর্মযজ্ঞে।
সামর্থ্যবান মুসলমানরা কুরবানির পশু কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ বা ইতিমধ্যে কিনেও ফেলেছেন। সুযোগ থাকলে কুরবানির পশু আগে আগে কেনা ভালো। পশুর সঙ্গে যেন কুরবানিদাতার একটা সম্পর্ক হয়। একটু ভালোবাসা ও মায়া জন্মে। কুরবানির পশুর যত্ন নেওয়া ও যথাযথ পরিচর্যা করা একটি জরুরি বিষয়। নবীজি (সা.)-ও এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।
কেনার সময় থেকে জবাই করা পর্যন্ত নানা ধাপে পশুর যত্ন ও পরিচর্যা নিতে হবে। হাট থেকে পশু কেনার পর বাসা দূরে হলে পিকআপ ভ্যানে করে আনাই ভালো। সাধারণত হাটবাজারে ব্যবসায়ীরা পশুকে পর্যাপ্ত খাদ্য দেয় না। যার কারণে পশু এমনিতেই কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
আবার অনেক পশু হাঁটায় অভ্যস্ত থাকে না। এই অবস্থায় হাঁটিয়ে আনা হলে পশুর কষ্ট বেড়ে যায়। যদি পিকআপে আনা সম্ভব না হয় তা হলে শান্তশিষ্টে ও ধীরে ধীরে আনা। কোনোভাবেই দৌড়িয়ে না আনা। প্রয়োজনে মাঝপথে জিরিয়ে নেওয়া উচিত।
ভুসি, খৈল, গাছের পাতা, ঘাস ও খড় আগের থেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। এই সময়ে পশু ক্ষুধার্ত থাকে। হাঁটিয়ে আনলে পিপাসা ও ক্ষুধা আরও বৃদ্ধি পায়। তাই বাসায় আনার পরপর পশুকে খাদ্য ও পানীয় দিতে হবে।
পশুর গায়ে ময়লা থাকলে বাসায় এনে গোসল করানো। গায়ের ময়লা ধুয়ে পরিষ্কার করা। পশুর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের অন্তরের অবস্থা দেখেন। কার অন্তরে কী আছে তা তিনি জানেন। পশুর প্রতি মমত্ববোধ ইসলামের শিক্ষা।
কুরবানির পশুর প্রতি আরও বেশি মমত্ববোধ থাকা জরুরি। এই পশু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হবে। আল্লাহর সামনে নিজের প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করাই উত্তম।
পশুকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে, শান্ত-শীতল পরিবেশে রাখতে হবে। অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা স্থানে না রাখা। প্রতিদিন পশুর গোবর, উচ্ছিষ্ট খাদ্য, চুনা ইত্যাদি পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা। পরিবেশ যেন দূষিত না হয়। কুরবানির দিন সকাল সকাল পশুকে গোসল করানো। যাতে গায়ে লেগে থাকা ময়লা-গোবর ইত্যাদি পরিষ্কার হয়ে যায়।
জবাই করার জন্য পশু শোয়ানোর সময় খুব বেশি ধস্তাধস্তি করা ঠিক নয়। কৌশলে যত্নের সঙ্গে শুইয়ে দেওয়া। শোয়ানোর পর দেরি না করে দ্রুত জবাই করা। পশু জবাই করার ক্ষেত্রেও বিশেষ যত্ন জরুরি। জবাই করার জন্য ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে। জবাইয়ের আগেই ছুরি ইত্যাদি ভালোভাবে ধারিয়ে নিতে হবে। যেন জবাই প্রক্রিয়া সহজ হয়। ধারহীন ছুরি দিয়ে পশু জবাই না করা।
এতে বারবার পশুর গলায় চাপ প্রয়োগ করতে হয় এবং পশুর কষ্ট হয়। শোয়ানোর পর ছুরি ধার দেওয়া উচিত নয়। এটা পশুর প্রতি অবিচার। হাদিসে এসেছে, ‘নবীজি (সা.)-এর যুগে এক ব্যক্তি একটি ছাগল শুইয়ে তার গর্দানে নিজ পা রেখে ছুরি ধার দিচ্ছিল। তা দেখে নবীজি (সা.) বলেন তুমি কি চাও পশুটি দুইবার মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করুক?’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৪/৩৩)
পশুর সামনে ছুরি ধার না দেওয়া। এতে পশুর কষ্ট হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে পশুর দৃষ্টিসীমার বাইরে ছুরি ধার দিতে নির্দেশ দিয়েছেন’ (ইবনে মাজাহ : ২/১০৫৯)। এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই না করা। এতে জীবিত পশুর মধ্যে আতঙ্ক ও ভয় সৃষ্টি হয়। পশু কষ্ট পায়। (ফাতাওয়া শামি : ৬/২৯৬)
জবাইয়ের সময় যতটা সম্ভব পশুর প্রতি সহমর্মী থাকা ও সহজে জবাই করার চেষ্টা করা। হাদিসে এসেছে, হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক বিষয়ে তোমাদের ওপর ইহসান (সুন্দররূপে সম্পাদন করা) আবশ্যক করেছেন।
সুতরাং তোমরা যখন কোনো পশু জবাই করবে তখন উত্তম পন্থার সঙ্গে করবে। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধার করে নেয় এবং তার জবাইকৃত জন্তুকে কষ্টে না ফেলে।’ (মুসলিম : ১৯৫৫)
জবাই করার সময় মাথাকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা মাকরুহ। এতে পশুকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া হয়। জবাইয়ের পরপরই চামড়া খসানোর জন্য তাড়াহুড়ো করা ঠিক হবে না। পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো উচিত নয়। নিস্তেজ হওয়ার আগপর্যন্ত পশুর মধ্যে প্রাণ বিদ্যমান থাকে। সুতরাং এই অবস্থায় চামড়া খসানো মানে জীবিত পশুর চামড়া খসানো।
এতে পশুর অধিক কষ্ট হয়। তাই পশুর শরীর থেকে সম্পূর্ণ রক্ত বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরুহ (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২২৩)।
সর্বোপরি কুরবানির পশুকে কোনো প্রকার কষ্ট না দেওয়া। পশুর প্রতি সদয় ও দয়াবান হয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালন করা এবং কেবলমাত্র তাঁর জন্যই কাজটা করছি- তা মনে-প্রাণে দৃঢ় রাখা।
/এসএকে