নজরুলের শৈশব ছিল সংগ্রামী, বিচিত্র আর বাঁধনহারা। ছিল প্রকৃতির মতো চঞ্চল আর অবিরাম সৃজনকর্মে সমৃদ্ধ। মূলত বাবা হারানোর পর একদিকে হয়েছেন অসহায়, অন্যদিকে হয়ে উঠেছিলেন বনের পাখির মতো মুক্ত। পাখির স্বভাব গান করা। বনভূমিকে নেচে গেয়ে মাতিয়ে রাখা পাখির কাজ। নজরুল গান গাওয়ার জন্য যতগুলো জায়গা পেয়েছিলেন, এর মধ্যে লেটো গানের দলে যোগ দেওয়া ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ছিল আত্মপরিচয় উন্মোচনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ।
আট বছর নয় মাস বয়সে বাবা কাজী ফকির আহমেদ পৃথিবীকে বিদায় জানালে অতি দুঃখ-যাতনা-অভাব নজরুলকে তাড়া করতে লাগল। তাকে তাড়া করল আরেকটা জিনিস, নিজের ভেতরের সৃজনপাখি- যে ডানা মেলে উড়তে চায় বর্ণিল আকাশে। একদিকে অন্নচিন্তা, অন্যদিকে সৃজনচিন্তা- দুদিক থেকেই তাকে চেপে ধরে। অন্ন সন্ধানে মসজিদের মুয়াজ্জিন, ইমাম, মাজারের খাদেম, রেলওয়ের খানসামা, রুটির দোকানের কর্মচারীগিরিসহ কতকিছুই না করতে হয়েছে তাকে!
কিন্তু এতকিছুর ভেতরেও অফুরান প্রাণশক্তি তাকে বারবার মুখোমুখি করে দিয়েছে জীবনের নানা রং-রূপ-বর্ণের সঙ্গে। বাবার মৃত্যুর পর আর পড়াশোনা হবে, এ দুরাশা তার মধ্যে অতটা ছিল না। গবেষকদের মতে, ১১ বছর বয়সেই চাচা বজলে করিমের প্রভাবে নজরুল লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন। স্বনামধন্য এবং অপরাজেয় গোদাকবি ওই চাচাই তার লেটো গানের গুরু। দলে যোগ দিয়ে প্রথমে নজরুল শিখেছিলেন লেটো গানের নানা বিষয়-আশয়।
সুর-স্বর শেখার পাশাপাশি শিখেছিলেন গানের ভেতর তীক্ষè শব্দ জুড়ে দিয়ে গানকে আসর উপযোগী করে তোলার যাবতীয় কৌশল।
লেটোর গানের দল হলো পশ্চিম বাংলার রাঢ় তথা মালদহ ও মুর্শিদাবাদ এলাকার কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল। ওই সময়ে আমাদের এ অঞ্চলে প্রচলিত অনেকটা যাত্রাপালার মতো হলেও ঠিক যাত্রাপালা নয়। ওখানে থাকত সৃজনশীলতার এক অসাধারণ চর্চার আবহ, তর্ক, যুক্তিখণ্ডন, প্রশ্নোত্তর এবং মূল্যায়ন। বলা যায়, সত্যিকার নজরুলের প্রাথমিক জন্ম ওই লেটোর দলেই। ওই গানের আসর থেকেই নিজের ভেতরের নজরুলকে তিনি মানুষের মঞ্চে এনে উপস্থাপন করেছিলেন।
নজরুলের রচিত লেটো গান, লেটো পালা বা চাপান সংগুলোতে তার অসামান্য কবি-প্রতিভার পরিচয় যেমন পাওয়া যায়, তেমনি তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপট, আর্থ-সামাজিক দ্বন্দ্ব, নজরুলের অতুলনীয় রসবোধ এবং প্রতিপক্ষ গোদাকবিকে ঘায়েল করার মতো তীব্র ও তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ এবং বাক্যবাণেরও সন্ধান পাওয়া যায়। ইসলাম ধর্মের শরিয়তি-মারফতি ও সুফি দর্শন, বাউল দর্শন, হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি, বৈষ্ণব ও শাক্ত দর্শন সম্পর্কে আগেই নজরুলের ধারণা তৈরি হয়েছিল। সে সব অর্জিত বিষয়ভিত্তিক দক্ষতায় তিনি গান ও পালা রচনা করে দর্শক-শ্রোতাকে চমকে দিতেন।
কোনো এক আসরে প্রতিপক্ষের গোদাকবি নজরুলকে ‘বেঙাচি’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন। বজলে করিম দুখু মিয়ার মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন জ্বলন্ত আগুনের ফুলকি। তাই পরের আসরে কাজী বজলে করিম জবাবী গানে মন্তব্য করেছিলেন- ‘ও বেঙাচি নয়, গোখরো’। নজরুল সেটি প্রমাণ করেছিলন। এক আসরে বিপক্ষ দল গানের ভেতর দিয়ে নানারকম সওয়াল (প্রশ্ন) করছিল। বালক কবি নাচতে নাচতে, কোমর দুলিয়ে, ঘাড় নেড়ে নেড়ে দুহাত উপরে তুলে সুর করে সব প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর দিয়ে সবার মন কেড়েছিলেন।
বজলে করিমের পরে নজরুল গোদাকবি হিসেবে দলের দায়িত্ব পান। এই সময় লেটো দলের শিল্পীরা তাকে ‘ভ্রমর কবি’ উপাধি প্রদান করেন। এই নামটি নজরুলের একাধিক গানেও পাওয়া যায়। বীরভূম জেলার দুবরাজপুরে গ্রাম্যমেলার এক গানের আসরে তিনি ‘খুদে ওস্তাদ’ উপাধিও পেয়েছিলেন। সে সময়ে লেখা গানের কোথাও কোথাও নজরুল ভণিতাও ব্যবহার করেছেন। ভণিতার ক্ষেত্রে ‘নজরুল এসলাম, নজরুল ইসলাম, দুখু মিয়া, দুখু কাজী, এমনকি ভ্রমর কাজী এবং ভ্রমর কবিও ব্যবহার করেন।
অবাক হওয়ার বিষয়, লেটোর দলে যুক্ত হয়ে আড়াই-তিন বছরেই নজরুল রচনা করেছিলেন চার শতাধিক গান। জানা যায়, সে সময় নজরুল অন্তত তিনটি লেটোর দলের জন্য গান লিখেছেন। এ প্রসঙ্গে নজরুলের আত্মীয় কাজী আনোয়ারুল ইসলাম নজরুলের বাল্যজীবন প্রবন্ধে উল্লেখ করেন- ‘বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না।
তাই নজরুল লেটোর দলে গান এবং নাটক রচনা করে দিয়ে অর্থ উপার্জন করতেন। তার বয়স বারো-তেরো বছর মাত্র। এ সময়ে রচনা তার এত ভালো হতে লাগল যে ক্রমে তিনি ‘নিমশা’ ও ‘চুরুলিয়া’ এবং ‘বাখাখুড়া’ এ তিনটি লেটোনাচের দলে নাটক রচনা করে গেলেন।’
সেসব গানে বা পালানাটকে থাকতে হতো হাস্যরসের উপাদান। থাকত প্রচলিত অসঙ্গতির প্রতি সূক্ষ্ম খোঁচা। থাকত ছন্দের দোলাও। নজরুলের আগে যারা লেটোর গান লিখতেন, তাদের লেখায় হাস্যরস বা অসঙ্গতির প্রতি ইঙ্গিত থাকলেও সেগুলো ছিল অতি সস্তা। নজরুলকে তারা পেলেন পরিপূর্ণভাবে। তারা পেলেন একজন পরিপূর্ণ কবিকে। পেলেন সত্যিকার শিল্পীকে।
সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজন মেটাতে নজরুলকে নানা বিষয়ে গান লিখতে হতো।
নজরুলের লেটো গানের লিরিক বা গানের দুটি আংশিক উদাহরণ :
ক) দারা শিকোহ :
‘খোদার লীলা কে বুঝিতে পারে,/ আহা কে বুঝিতে পারে।
আজ যে আমির, কাল সে ফকির,/ এই ধরণীর পরে॥
নাদিরা বানু বেগম ছিল,/ মরুর ধুলায় প্রাণ হারাল,
মরুর মাঝে কবর হলো,/ হায় কপালের ফেরে॥’
খ) চাষার সং : ‘নয়টা নালা আছে তাহার/ ওজুর পানি সিয়াত যাহার,
ফল পাবি নানা প্রকার/- ফসল জন্মিবে তাহাতে॥’
সামগ্রিকভাবে নজরুল-সৃষ্ট লেটো গান তিনভাগে বিভক্ত-
১. চাপান সং : ‘চাপান’ মূলত বাংলার লোকসংগীত বা কবিগানের একটি বিশেষ অংশ। কবিগানের প্রতিযোগিতায় দুটি দল থাকে। এক দলের গায়ক (কবিয়াল) যখন গানে গানে প্রতিপক্ষ দলের প্রতি কোনো প্রশ্ন বা যুক্তিনির্ভর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, তখন সেই অংশটিকে ‘চাপান’ বলা হয়। ‘চাপান’ শব্দটি সাধারণত ‘চাপানো’ বা প্রশ্ন তোলা থেকে এসেছে। এই তালিকায় যে গানগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, সেগুলো হলো- অন্ধরাজা, এককন্যা-তিন বর, এক যুবতীকে দুই যুবক বৌ বলে দাবি করছে, সে যাবে কার কাছে?, কংসবধ, কলঙ্কভঞ্জন, কুশ ও লব, দাতাকর্ণ, দেবযানী-শর্মিষ্ঠা, পায়রা-পায়রী, বানর রাজকুমারের সং, ভক্ত মুচি, মেঘনাদবধ, রাজপুত্র-মন্ত্রীপুত্র, রাজা হরিশচন্দ্র, রাজা যুধিষ্ঠির।
২. উতোর সং : চাপান গানের পরেই আসে ‘উতোর’, যেখানে অন্য দলের কবিয়াল তাৎক্ষণিকভাবে সেই প্রশ্নের জবাব বা খণ্ডন করে থাকেন এবং পাল্টা আরেকটি প্রশ্ন ‘চাপান’ করেন। এই পুরো প্রশ্নোত্তর ও বাগযুদ্ধকে একত্রে ‘চাপান-উতোর’ বলা হলেও দ্বিতীয় অংশটিকে উতোর বলে। এ পর্বে নজরুলের তিনটি উতোর সং বা গানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো- কর্ণবধ, যজ্ঞের ঘোড়া ও হারানো আংটি।
৩. পালাগান : পালাগান হলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাহিনিমূলক লোকসংগীত। সাধারণত একজন মূল গায়েন (বয়াতি) ও কয়েকজন দোহার মিলে প্রশ্ন-উত্তর ও কথোপকথনের মাধ্যমে এই গান পরিবেশন করেন। এতে পৌরাণিক, ঐতিহাসিক বা লৌকিক কাহিনির সঙ্গে তত্ত্ব ও দর্শনের মিশ্রণ থাকে। নজরুল অনেক পালাগান রচনা করেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- আকবর বাদশা, চাষার সং, জেলে ও জেলেনী, বাছুরীর খোঁজে, ঠকপুরের ঠগ, বনের মেয়ে পাখি, বিদ্যাভুতুম, বুড়ো জমিদার, বৌ-এর বিয়ে, সুদখোর ব্রজেন মুখার্জি, যুবরাজ শিকোহ, রাজা জয়চাঁদের ধর্মপরীক্ষা, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া ও হারাধনের বিয়ে।
লেটোর দলে সঙ্গী-সাথীদের কাছে রীতিমতো গুরু হয়ে উঠেছিলেন নজরুল। নজরুল আবার স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিলে লেটোর দল থেকে নজরুলের বিদায় তার ভক্তদের খুবই আহত করেছিল। তারা লিখল-
‘আমরা এই অধীন, হয়েছি ওস্তাদহীন
ভাবি তাই নিশিদিন
নামেতে নজরুল ইসলাম
কী দিব গুণের প্রমাণ।’
মাত্র এগারো থেকে তেরো বছর বয়সে লেখা নজরুলের এই গানগুলো অসামান্য নজরুলপ্রতিভার পরিচয় বহন করে। পরবর্তী জীবনে এগুলো তার বিচিত্র গান রচনা ও গায়কীর ক্ষেত্রে অনুপেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। এ গানগুলো বাংলার লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। নজরুলের ব্যাপক গানের ভুবনে অন্তর্ভুক্ত করে লেটো গানের অনেকগুলোই গাওয়া হলেও সমাজ ও রাষ্ট্রীয় আঙ্গিকে এগুলোর চর্চা না থাকলে লেটো গানের ধারণাটুকুই কেবল টিকে থাকবে। আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বেরই প্রমাণক ঐতিহ্যবাহী এসব লোকগানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সবারই দায়িত্ব।
/কেএইচও