বারোআনি গ্রামের মানুষ লাল চাঁদ মিয়াকে একনামে চিনত। তার গায়ের রং ছিল একটু লালচে, মাথায় সবসময় লাল গামছা বাঁধতেন, তাই ছোটবেলা থেকেই সবাই তাকে ‘লাল চাঁদ’ বলে ডাকত। আর তার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ছিল এক টকটকে লাল রঙের বিশাল ষাঁড়। তাই গ্রামের সবাই বলত- ‘ওই যে, লাল চাঁদের লাল ষাঁড়!’
লাল চাঁদ মিয়া ষাঁড়টাকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসতেন। সকালে নিজেই খড় দিতেন, দুপুরে নদীর ঘাটে নিয়ে গোসল করাতেন, আর বিকালে তার গলায় নতুন ঘণ্টা বেঁধে মাঠে হাঁটাতেন। তিনি গর্ব করে বলতেন, আমার ষাঁড় একদিন হাটের সেরা হবে!
একই গ্রামের তিন দুষ্টু বন্ধু- লালু, কালু আর ভুলু প্রতিদিনই ষাঁড়টাকে দেখে মজা করত। তারা বলত- এটা ষাঁড় না, গ্রামের লাল রাজা! একদিন পূর্ণিমার রাতে আকাশে উঠল অদ্ভুত লালচে চাঁদ। গ্রামের বুড়োরা আকাশ দেখে ফিসফিস করতে লাগল। কেউ বলল, আজ চাঁদের রং কেমন অস্বাভাবিক!
আরও পড়ুন
সেই রাতে তিন বন্ধু মাঠে খেলছিল। লালু হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, এই যে, আজ তো আকাশেও লাল চাঁদ। কালু হেসে বলল, তা হলে নিচেও লাল চাঁদ, ওপরেও লাল চাঁদ!
ভুলু মজা করে বলল, চল, লাল চাঁদ মিয়ার ষাঁড়কে দেখাই। দেখি কী করে! তিনজন চুপিচুপি লাল চাঁদ মিয়ার গোয়ালঘরের সামনে গেল। লাল ষাঁড় তখন শান্ত হয়ে ঘাস চিবাচ্ছিল। লালু আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলল, ওই দেখ, তোর মালিকের নাম আকাশে উঠে গেছে।
ষাঁড়টা সত্যি সত্যিই মাথা তুলে চাঁদের দিকে তাকাল। তারপর এমন জোরে ‘হাম্বা’ ডাক দিল যে, আশপাশের কুকুর পর্যন্ত ঘেউঘেউ শুরু করল। এরপর যা হলো, কেউ কল্পনাও করেনি। ষাঁড়টা হঠাৎ দড়ি ছিঁড়ে দৌড় দিল। সোজা মাঠের দিকে। তিন বন্ধু প্রাণপণে পেছনে দৌড়াচ্ছে। আর লাল চাঁদ মিয়া ঘর থেকে বের হয়ে চিৎকার করছেন, ওরে, আমার লাল ষাঁড় গেল!
মাঠে তখন কয়েকজন লোক বসে গল্প করছিল। তারা দেখল বিশাল লাল ষাঁড় ছুটে আসছে। একজন দৌড়ে পুকুরে ঝাঁপ দিল। আরেকজন তালগাছে উঠতে গিয়ে মাঝপথে আটকে গেল। একজন আবার নিজের গামছা ফেলে পালাল। লাল চাঁদ মিয়া দৌড়াতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে কাদায় গড়াগড়ি খেলেন। তবু উঠে আবার দৌড়ালেন।
ষাঁড়টা মাঠের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। মাথা উঁচু করে লাল চাঁদের দিকে তাকিয়ে আবার ডাক দিল- ‘হাম্বা! লালু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ও বুঝি আকাশের চাঁদকে নিজের মালিক ভেবেছে! কালু বলল, হয়তো তাই ভাবছে, মালিক আকাশে উঠে গেছে, তাকে ডাকছে। ভুলু বলল, না, ও ভাবছে আকাশে আরেকটা লাল ষাঁড় আছে।
এই কথা শুনে তিনজন এমন হেসে উঠল যে মাটিতে বসে পড়ল। হাসির আসল দৃশ্য তখনও বাকি। ষাঁড়টা হঠাৎ ধুলাউড়ি হাটের দিকে দৌড় দিল। সেখানে সবজিওয়ালা বসেছিল। গিয়ে সে কুমড়ার স্তূপে শিং ঢুকিয়ে দিল। কুমড়া চারদিকে গড়িয়ে গেল। একটা কুমড়া গিয়ে চায়ের কেটলিতে ধাক্কা খেল, আরেকটা গিয়ে মসজিদের সিঁড়িতে থামল।
একটা কুমড়া সোজা কালুর পায়ের কাছে এসে থামতেই সে চিৎকার করে দৌড় দিল, বাঁচাও! ষাঁড়ের বাচ্চা এসেছে।
সবাই এত হাসল যে হাটের দোকানদাররাও বসে পড়ল। পরদিন সকাল থেকে পুরো বারোআনি গ্রামে একটাই আলোচনা- লাল চাঁদের লাল ষাঁড় নাকি চাঁদ দেখে পাগল হয়েছে।
লাল চাঁদ মিয়া মুখ গম্ভীর করে বললেন, ‘আর যেন কেউ আমার ষাঁড়কে চাঁদ দেখাবে না, দিব্যি রইল।’
এএডি/