কুরআনে কুরবানির অন্তর্নিহিত দর্শন

সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান

ইসলাম

পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে কুরবানির উদ্দেশ্য, তাৎপর্য ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা অত্যন্ত গভীরভাবে বর্ণিত হয়েছে। কুরবানি আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, তাকওয়া,

2026-05-23T05:26:02+00:00
2026-05-23T05:26:02+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
কুরআনে কুরবানির অন্তর্নিহিত দর্শন
সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ৫:২৬ এএম 
সংগৃহীত ছবি
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে কুরবানির উদ্দেশ্য, তাৎপর্য ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা অত্যন্ত গভীরভাবে বর্ণিত হয়েছে। কুরবানি আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, তাকওয়া, আত্মসমর্পণ ও ত্যাগের এক মহান প্রতীক। কুরআনের আয়াতগুলোতে কুরবানির শিক্ষা এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, ইখলাস ও আত্মশুদ্ধির চেতনা জাগ্রত করে এবং তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে আত্মনিবেদনের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তায়ালা সুরা মায়েদার ২৭ নম্বর আয়াতে হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানির ঘটনা বর্ণনা করেছেন। 

সেখানে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি তাদের কাছে আদমের দুই পুত্রের ঘটনা বর্ণনা করুন, যখন তারা উভয়ে কুরবানি পেশ করল। অতঃপর তাদের একজন থেকে গ্রহণ করা হলো, আর অপরজন থেকে গ্রহণ করা হলো না। সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। অন্যজন বলল, আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের থেকে গ্রহণ করেন।’ এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, কুরবানির মূল বিষয় বাহ্যিক আয়োজন নয়; বরং অন্তরের তাকওয়া, নিষ্ঠা ও একনিষ্ঠ আল্লাহভীতি। পশুর আকার, মূল্য কিংবা বাহ্যিক জাঁকজমক আল্লাহর কাছে মুখ্য নয়, বরং বান্দার অন্তরের ইখলাসই হলো প্রকৃত গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি।

পবিত্র কুরআনের সুরা আল-হজের ৩৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, প্রত্যেক উম্মতের জন্যই কুরবানির বিধান ছিল। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে, যেসব চতুষ্পদ জন্তু তিনি রিজিক হিসেবে দিয়েছেন তার ওপর। তোমাদের ইলাহ তো এক আল্লাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করো এবং আনুগতদের সুসংবাদ দাও।’ এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, কুরবানি কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতির ইবাদত নয়, বরং এটি নবী-রাসুলদের ধারাবাহিক সুন্নাহ এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ।
আরও পড়ুন

কুরবানির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ও অনুপম দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সুরা আস-সাফফাতের ৯৯ থেকে ১০৭ নম্বর আয়াতে। হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করতে উদ্যত হন। এটি ছিল ভালোবাসা, ত্যাগ ও আনুগত্যের এক সর্বোচ্চ পরীক্ষা। আয়াতগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি আমার রবের দিকে যাচ্ছি তিনি অবশ্যই আমাকে হেদায়েত করবেন। হে আমার রব, আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন। অতঃপর তাঁকে আমি পরম ধৈর্যশীল একজন পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর যখন সে তাঁর সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছাল তখন সে বলল, হে আমার পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি তোমাকে জবাই করছি এখন তুমি দেখো তোমার অভিমত কী? সে বলল, হে আমার পিতা আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা করুন। খোদা ইচ্ছে করলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। অতঃপর উভয়ে যখন আমার নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণ করল এবং পিতা পুত্রকে মাথার ওপর ভর করে শায়িত করল আমি তখন তাঁকে আহ্বান করে বললাম হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্য করে দেখালে। আমি এভাবে পুরস্কৃত করে থাকি সৎকর্মশীলদের। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা ছিল এবং আমি এক মহান কুরবানি তার বিনিময়ে তাঁকে মুক্ত করে দিয়েছি। এই ঘটনা মানবজাতির জন্য আত্মসমর্পণ, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের চিরন্তন দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।’

অন্য ইবাদতের মতো কুরবানিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। একজন মুমিন যখন কুরবানি করে তখন সে মূলত নিজের প্রবৃত্তি, অহংকার ও পার্থিব মোহকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিসর্জন দেওয়ার অঙ্গীকার করে। এ প্রসঙ্গে সুরা কাউসারের ২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।’ সুরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছুই আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক।’ এই আয়াত কুরবানির প্রকৃত অর্থকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে একজন মুমিনের পুরো জীবনই আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়া উচিত। কুরবানি সেই আত্মনিবেদনেরই প্রতীক।

সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত কিংবা রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ এই আয়াত কুরবানির মূল দর্শনের সারসংক্ষেপ। কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য পশু জবাই নয়; বরং অন্তরের পরিশুদ্ধি, আল্লাহভীতি ও আত্মত্যাগের মানসিকতা অর্জন। তাই কুরবানি যদি লোকদেখানো প্রতিযোগিতা, অহংকার কিংবা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উপকরণে পরিণত হয়, তবে তার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নষ্ট হয়ে যায়। সুরা আনআমে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যে পশুর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে তা থেকেই আহার করতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো, যদি তোমরা তাঁর আয়াতগুলোতে বিশ্বাসী হয়ে থাকো’ (সুরা আনআম : ১১৮)। আবার ১২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তা থেকে আহার করো না, যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি। নিশ্চয়ই তা সীমালঙ্ঘন।’ এই আয়াতগুলো মুসলমানের জীবনে হালাল-হারামের গুরুত্ব এবং প্রতিটি কাজে আল্লাহর স্মরণকে অপরিহার্য করে তোলে।

পবিত্র কুরআনের এসব আয়াত আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, কুরবানি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির এক মহান প্রতীক। 

কুরবানির মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের অন্তরের অহংকার, লোভ, স্বার্থপরতা ও পার্থিব মোহকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষা লাভ করে। এই আমল মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রকৃত সফলতা বাহ্যিক জাঁকজমকে নয়; বরং অন্তরের ইখলাস, আল্লাহভীতি ও একনিষ্ঠ আনুগত্যেই নিহিত। কুরবানির শিক্ষা ব্যক্তি জীবনকে যেমন পরিশুদ্ধ করে, তেমনি সমাজে সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ত্যাগের চেতনাও জাগ্রত করে। তাই কুরবানির প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে বাহ্যিক আয়োজনের পাশাপাশি অন্তরের তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কুরবানি হোক আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক জীবন্ত প্রেরণা।

এএডি/


  বিষয়:   কুরআন  কুরবানি  অন্তর্নিহিত  দর্শন 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: