গাইবান্ধার শহর-গ্রামে এখন চোখে পড়ে ব্যস্ততার ছবি। ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই কৃষক রহমত আলী তার গোয়ালঘরে ঢোকেন। সেখানে বাধা আছে তিনটি হৃষ্টপুষ্ট দেশি গরু- সারা বছর যত্ন করে পালন করেছেন, এখন কোরবানির হাটে বিক্রির অপেক্ষায়। ‘এই তিনটা গরু বেচলে সংসারের অনেক কিছু হবে। ছেলের বেতন, মেয়ের পড়ার খরচ- সব মিলিয়ে এটাই আমার বড় আয়ের সময়’ বলতে বলতে মুখে হাসি ফোটে তার।
রহমত আলী একা নন। গাইবান্ধার সাত উপজেলার হাজার হাজার খামারি, প্রান্তিক কৃষক ও গৃহস্থ পরিবারগুলো এই মুহূর্তে একটি বিশেষ প্রতীক্ষায় আছেন- ঈদুল আজহা। আসন্ন কোরবানির ঈদকে ঘিরে গাইবান্ধার স্থানীয় অর্থনীতিতে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্য। পশু পালন থেকে শুরু করে হাটে বেচাকেনা, পরিবহন, কসাই, শ্রমিক, মসলার দোকান, চামড়ার ব্যবসা- সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি বহুস্তরীয় অর্থনৈতিক শৃঙ্খল, যা প্রান্তিক মানুষের জীবনে বছরের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক উদ্দীপনা হয়ে আসে।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, এ বছর ঈদুল আজহায় জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০টি। সেই লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮৩ গবাদিপশু। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে প্রায় ৩৯ হাজার ৪৮৩টি পশু বেশি প্রস্তুত থাকায় উদ্বৃত্ত পশু জেলার বাইরে, বিশেষত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে। কোরবানির জন্য এ বছর দেশি-বিদেশি, শাহীওয়াল, হরিয়ানা ও শংকর জাতের গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া প্রস্তুত করেছেন স্থানীয় খামারি, প্রান্তিক কৃষক ও গৃহস্থ পরিবারগুলো। পশু মোটাতাজাকরণে বাড়তি যত্ন নিয়েছেন তারা।
খামারি জুয়েল ইসলাম জানান, তার ফার্মে ছোট-বড় দুই শতাধিক বিভিন্ন জাতের গরু রয়েছে, যার দাম সর্বনিম্ন ৮০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। তবে গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার লালন-পালনের খরচও বেড়েছে বলে জানান তিনি।
গাইবান্ধা সদর, সাঘাটা, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ- এই সাত উপজেলাজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে হাজারেরও বেশি পরিবার পশু পালনে যুক্ত। কেউ বাণিজ্যিক খামারে, কেউ বাড়ির গোয়ালঘরে।
জেলার ১৭ হাজার ৩৩১টি খামার এবং প্রান্তিক কৃষক ও ১৬৫টি চর-দ্বীপচরের মানুষের ঘরে এখন মজুত রয়েছে ৩৭ হাজার ৬৬০টি ষাঁড়, ৩ হাজার ৫৭২টি বলদ, ২২ হাজার ৪৬০টি গাভি, ১৫৩টি মহিষ, ১ লাখ ২ হাজার ৭৮৮টি ছাগল, ১০ হাজার ২৮৯টি ভেড়া এবং অবশিষ্ট দুম্বা। জাতীয় পর্যায়ে এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর মোট প্রাপ্যতা রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখেরও বেশি এবং চাহিদা ১ কোটি ১ লাখের কিছু বেশি। ফলে, প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী। গাইবান্ধার উদ্বৃত্ত পশু এই জাতীয় সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ঈদের মাস দুয়েক আগে থেকেই গাইবান্ধার বিভিন্ন হাট-বাজারে পশু আসতে শুরু করে। স্থায়ী হাটের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বসে বিশেষ পশুর হাট। প্রতিটি উপজেলায় একাধিক নির্ধারিত হাট রয়েছে, যেখানে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বেচাকেনা চলে। এবার জেলায় মোট ৩২টি হাট নির্ধারণ করা হয়েছে- ১৯টি স্থায়ী, ১৩টি অস্থায়ী। গোবিন্দগঞ্জের নাকাইহাট, সদরের দাড়িয়াপুর ও লক্ষ্মীপুর, সাঘাটার ভরতখালী হাট- এগুলো ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট হিসেবে পরিচিত। কোরবানির মৌসুমে এই হাটগুলো হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল। শত শত পশু নিয়ে ব্যাপারী ও খামারিরা আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। পাশাপাশি সুযোগ রাখা হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও খামার পর্যায়ে সরাসরি কেনাবেচার।
হাটকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে শুধু পশু বেচাকেনাই নয়, তৈরি হয় আনুষঙ্গিক ব্যাবসারও সুযোগ। হাটের আশপাশে চায়ের দোকান, খাবারের স্টল, দড়ি-বেড়ির দোকান, ঘাস-খড়ের বিক্রেতা- সবকিছু মিলিয়ে প্রতিটি হাটের দিন শত শত পরিবার আয়ের সুযোগ পায়। হাটের ইজারাদারদেরও কোটি টাকার কারবার হয় এই মৌসুমে।
জেলার প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, কোরবানির পশুর মান নিশ্চিত করতে প্রতিটি হাটে পশু চিকিৎসক ও পরিদর্শক মোতায়েন রাখা হয়। হরমোন বা ক্ষতিকর ওষুধ দিয়ে মোটাতাজাকরণ রোধে বিশেষ নজরদারি চলছে এবছরও।
গাইবান্ধার অধিকাংশ পশু পালনকারী প্রান্তিক কৃষক পরিবার। একজন গৃহস্থ মহিলা সারা বছর একটি বা দুটি ছাগল পালন করেন। কোরবানির আগে সেগুলো বিক্রি করে পান ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এই টাকাটুকুই তার সংসারের বাড়তি সঞ্চয়। মাঝারি মানের একটি দেশি গরু পালনে খরচ পড়ে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। হাটে বিক্রি হয় দেড় থেকে আড়াই লাখে। এই মুনাফাই অনেক পরিবারের বার্ষিক বড় আয়ের উৎস।
ব্যাপারীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে কম দামে পশু কিনে হাটে বা ঢাকায় বেশি দামে বিক্রি করেন। তাদের একটি দক্ষ নেটওয়ার্ক রয়েছে। গাইবান্ধার মোন্নাফ গাজীর মতো ব্যাপারীরা মাঝারি আকারের দেশি গরু নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার হাটে যান। তিনি জানান, মাঝারি গরুর চাহিদাই বেশি এবং গাইবান্ধার দেশি গরুর একটি আলাদা কদর রয়েছে। এই ব্যাপারী শ্রেণিই মূলত গাইবান্ধার পশু সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
ঈদের তিন-চার দিন আগে থেকেই গাইবান্ধার গ্রামে গ্রামে কাজ পান দিনমজুররা- কেউ পশু পরিবহনে, কেউ হাট পরিষ্কারে, কেউ লোডিং-আনলোডিংয়ে। কসাই পেশায় যারা যুক্ত, ঈদের দিনটি তাদের বছরের সবচেয়ে বড় উপার্জনের দিন। একজন দক্ষ কসাই একদিনেই পাঁচ থেকে দশটি গরু জবাই করতে পারেন। প্রতিটিতে পাঁচ থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত পান। সহকারীরাও পান দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা। গাইবান্ধায় শত শত কসাই পরিবার সারা বছরের আয়ের একটা বড় অংশ উপার্জন করেন কোরবানি থেকে। পরিবহন খাতেও ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়। ট্রাক, পিকআপ, নছিমন ও ভ্যানে করে পশু পরিবহনে যুক্ত হন হাজারও শ্রমিক ও চালক। এ সময় পরিবহন ভাড়া স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা পরিবহন শ্রমিকদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে।
কোরবানির পরবর্তী পর্যায়ে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলের সবচেয়ে বড় অংশীদার হয়ে ওঠেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। প্রতি বছর কোরবানির ঈদে দেশে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ হয়, যা দেশের চামড়া শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই শিল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। গাইবান্ধায় ঈদের দিন বিকেল থেকেই চামড়া সংগ্রহ শুরু হয়। স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীরা পাড়া-মহল্লা থেকে কিনে নেন। এরপর সেগুলো আসে মাঝারি সংগ্রহকারীদের কাছে, তারা পাঠান ট্যানারি মালিকদের কাছে- প্রধানত ঢাকার সাভারে। এই বহুস্তরীয় সরবরাহ কাঠামোয় প্রতিটি স্তরে স্থানীয় মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। চামড়ার মূল্য বরাবরই একটি বিতর্কিত বিষয়। প্রতি বছর সরকার নির্ধারিত দাম ঘোষণা করলেও বাজারে তা কার্যকর হয় না বলে অভিযোগ করেন বিক্রেতারা। গাইবান্ধার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক সময় মাদ্রাসা ও এতিমখানায় চামড়া দান করা হয়, যা ধর্মীয় ও সামাজিক সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
কোরবানির ঈদে শুধু পশু বেচাকেনাই নয়, পাশাপাশি গাইবান্ধার স্থানীয় বাজারগুলোতে চলে মসলাপাতি, লবণ, বিরিয়ানির উপকরণ, প্লাস্টিকের পাত্র ও পলিথিন বিক্রি। মাংস সংরক্ষণ ও পরিবেশনের জন্য বিভিন্ন উপকরণের চাহিদা বাড়ে। ঈদের আগের সপ্তাহে গাইবান্ধারবিভিন্ন হাটে-বাজারে ক্রেতার ঢল নামে। নতুন জামা-কাপড়ের কেনাকাটাও এই সময়ে তুঙ্গে ওঠে। বস্ত্র ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানি ঈদের আগের দুই সপ্তাহ তাদের বার্ষিক বিক্রয়ের একটি বড় অংশ হয়ে থাকে। গ্রাম থেকে আসা মানুষরা শহরে এসে পশু বিক্রির টাকায় কেনাকাটা সেরে নেন।
ডিজিটাল পেমেন্ট ও অনলাইন হাটের প্রচলনও দিন দিন বাড়ছে। ক্রেতারা এখন অনলাইনে পশুর ছবি, ভিডিও, ওজন ও খামারের অবস্থান দেখে ঘরে বসেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। এই ডিজিটাল রূপান্তর গাইবান্ধার খামারিদের বাজারসুবিধা বিস্তৃত করেছে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনছে। ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রান্তিক কৃষকদের পশু পালনে ঋণ দেওয়া হয় বিশেষ শর্তে। এই ঋণে পশু কিনে লালন-পালন করেন তারা। তারপর কোরবানির হাটে বিক্রি করেন। এটি অনেক পরিবারের জন্য নিয়মিত ব্যাবসায়িক চক্র হয়ে দাড়িয়েছে।
এত সম্ভাবনার মধ্যেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গো-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পশু রোগের আশঙ্কা, হাটে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং পরিবহন অবকাঠামোর দুর্বলতা- এগুলো প্রান্তিক কৃষক ও খামারিদের লাভের অংশ কমিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোরবানিকেন্দ্রিক এই অর্থনীতিকে আরও সুসংগঠিত করতে হলে প্রয়োজন সরাসরি বাজার সংযোগ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক ব্যবহার এবং চামড়ার মূল্য নির্ধারণে কার্যকর সরকারি নজরদারি। গাইবান্ধার মতো পিছিয়ে পড়া জেলায় এই সুযোগগুলো কাজে লাগানো গেলে লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নত হতে পারে।
কোরবানি ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলটি একটি বার্ষিক চক্র- খামারি থেকে শুরু করে ব্যাপারী, হাট থেকে পরিবহন, কসাই থেকে চামড়া ব্যবসায়ী পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মানুষের জীবিকা নির্ভর করে এই একটি উৎসবের ওপর। এই শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী ও ন্যায়সংগত করাই এখন সময়ের দাবি।
প্রান্তিক কৃষক রহমত আলী হয়ত জানেন না জাতীয় অর্থনীতির বড় হিসাব-নিকাশ। কিন্তু তিনি ঠিকই জানেন, এই কদিনের হাটই তার সংসারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ঈদের চাঁদ ওঠার আগেই তিনি আশা করেন তার তিনটি গরুর জন্য ভালো দাম পাবেন। সেই আশাটুকুতেই টিকে আছে গাইবান্ধার লাখো প্রান্তিক মানুষের স্বপ্ন ও জীবন।
/মহু