ঢাকার আদালতে বিচারক সংকট দীর্ঘদিনের। শুধু বিচারক সংকটের জন্য বিচারপ্রার্থীদের আদালত প্রাঙ্গণে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পড়ে থাকতে দেখা যায়। এতে যেমন মানুষের কষ্ট বাড়ে, তেমনি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিচারক সংকট নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যাতে আদালতে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পেতে ভোগান্তি লাঘবে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ ক্রান্তিকালে বিচারপ্রার্থীদের দুর্দশা ও বিচারব্যবস্থার চরম ভোগান্তি চলছে। ঢাকার আদালতগুলো দেশের বিচারব্যবস্থার মূল স্তম্ভ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানে দীর্ঘদিন ধরে বিচারক সংকটের কারণে বিচার কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিচারক শূন্যতা ও পর্যাপ্ত বিচারকের অভাবের ফলে বিচারপ্রার্থীরা দিনের পর দিন আদালতে ঘুরেও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি কেবল বিচারপ্রার্থীদের জন্য নয়, দেশের আইনি ব্যবস্থার জন্যও বড় বিষয়।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে খোদ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদটিতেই দীর্ঘদিন ধরে কোনো বিচারক নেই। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এই পদে নিয়োগের পর থেকে এ আদালতে বিচারকশূন্য।
এর ফলে বিচারিক ও প্রশাসনিক কাজের ব্যাঘাত ঘটছে। একইভাবে মানব পাচার দমন সম্পর্কিত মামলার জন্য প্রতিষ্ঠিত একমাত্র আদালতটিও দীর্ঘদিন ধরে বিচারকশূন্য অবস্থায় আছে। ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতেও বিচারকশূন্যের সংখ্যা অনেক। যেমন- যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সিভিল জজ এবং অন্যান্য আদালতে বিচারক পদে নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে অসংখ্য মামলা।
বিচারকশূন্যতার কারণে মামলার বিচার বিলম্বিত হচ্ছে, মামলার জট বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণ, অভিযোগ গঠন, জামিন শুনানিÑ সবই ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আসামির অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ আদালতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন, তাদের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘদিন বিচারক না থাকায় আদালতগুলোতে ভারপ্রাপ্ত বিচারকদের দায়িত্বে চলছে বিচারকাজ, যা স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়ার বড় অন্তরায়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার বিভিন্ন আদালতে নিয়মিত বিচারক নেই। যেমন- মহানগর দায়রা জজ আদালতের চারটি অতিরিক্ত আদালতের মধ্যে ২০তম আদালত দীর্ঘদিন ধরে বিচারকশূন্য। চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসহ বেশ কয়েকটি আদালতেও পদ শূন্য। জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ অন্যান্য আদালতে নিয়োগের জন্য নির্দেশনা থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত হয়নি। ফলে নতুন আদালত প্রতিষ্ঠা কার্যত অচল হয়ে রয়েছে।
আদালতের একাধিক কর্মকর্তা ও আইনজীবী জানান, অনেক বিচারক পদোন্নতি বা বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। আবার কিছু আদালতে এখনও নিয়োগের কাজ সম্পন্ন হয়নি। এ পরিস্থিতিতে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার মামলা বিচারাধীন। ভুক্তভোগীরা বলেন, বিচারক না থাকায় তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মামলার দীর্ঘসূত্রতা তাদের জীবন ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
অবশ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছেন, শিগগিরই এই সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নতুন বিচারক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো দ্রুত নিশ্চিত না করলে এই সমস্যা দীর্ঘদিনের জন্য প্রকট হয়ে দেখা দেবে।
ঢাকার আদালত সংকট দেশের আইনি সুশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত পদোন্নতি, নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিচারক সংকট মোকাবিলা করতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এই সংকটের অবসান জরুরি। অন্যথায় বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাবে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে আইনজ্ঞরা মনে করছেন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও জরুরি উদ্যোগ। এ সংকট নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্টরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া স্বস্তিরতা ফিরিয়ে আনবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/জেডি