ইসরায়েলি হামলা, অবরোধ এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজা উপত্যকার প্রাণিসম্পদ খাত প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে টানা তৃতীয় বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য— কোরবানির পশু জবাই— অনেক পরিবারের জন্য সম্ভব হচ্ছে না।
গাজার একসময়ের শীর্ষ গবাদি পশু ব্যবসায়ী মাজেন আল-জেরজাভি জানান, আগে ঈদ মৌসুমে তিনি শত শত ভেড়া ও গরু বিক্রি করতেন। তখন পুরো গাজা জুড়ে কোরবানির জন্য পশুর ব্যাপক চাহিদা থাকত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। তার ভাষায়, এখন তার কাছে বিক্রির মতো কোনো পশুই নেই।
তিনি আরও বলেন, কঠোর অবরোধ ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গাজায় জীবিত কোনো পশু প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে স্থানীয়ভাবে পশু পালনের সক্ষমতাও প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। আগে যেখানে গাজায় বছরে হাজার হাজার পশু আমদানি করা হতো, এখন সেই সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ বা অনেক কমে গেছে।
যুদ্ধের আগে গাজায় ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো। ঈদের সময় পরিবারগুলো পশু কিনে কোরবানি দিত এবং মাংস আত্মীয়-প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে ভাগ করে দিত, যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য।
কিন্তু বর্তমানে সেই পরিস্থিতি নেই। অবরোধ, অবকাঠামো ধ্বংস এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে। খাদ্য ও পানির সংকটও তীব্র, যার ফলে ঈদের জন্য পশু কেনা অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু পশুর অভাবই নয়, পুরো প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। খামার, বাজার এবং সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে গেছে। ফলে ঈদের সময় যে সামাজিক মিলন ও ধর্মীয় আনন্দ ভাগাভাগি করা হতো, তা এখন আর আগের মতো নেই।
মানবিক সংকটের কারণে অনেক পরিবার এবার ঈদের কোরবানির ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে ঈদ এখন অনেকের কাছে আর আনন্দের উৎস না হয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামের আরেকটি দিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবাদি পশু প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে
গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর গাজার প্রাণিসম্পদ খাতের ৯০ শতাংশেরও বেশি ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে ইসরায়েলি হামলা এবং খাদ্য ও কৃষি সরবরাহ চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ।
স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি গাজায় জীবিত পশু প্রবেশও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এতে করে প্রাণিসম্পদ খাত কার্যত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে যায়।
এর ফলে বাজারে পশুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। যুদ্ধের আগে একটি ভেড়ার দাম যেখানে ছিল প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার, এখন সীমিত সংখ্যক অবশিষ্ট পশুর দাম বেড়ে প্রায় ৭,০০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানানো হচ্ছে।
গাজার এক পশুপালক মাজেন আল-জেরজাভি বলেন, তিনি এখন ভেড়া বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন, কারণ বাজারে পশু প্রায় নেই বললেই চলে। তার মতে, এখন অনেক প্রবাসী ফিলিস্তিনি ঈদের জন্য পশু কিনতে চাইলে তিনি তাদের নিরুৎসাহিত করেন।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে একটি ভেড়ার দাম এত বেশি যে তা দিয়ে একটি পরিবারের বড় প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হলেও কোরবানি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলে গাজার অন্তত ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে বা ধ্বংস হয়ে গেছে।
একসময় গাজার অন্যতম প্রধান তাজা মাংস ও দুগ্ধের উৎস ছিল এই প্রাণিসম্পদ খাত। এখন তা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা আরও সংকটাপন্ন হয়েছে।
খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্য গুদাম এবং পশুচিকিৎসা কেন্দ্রগুলোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। পশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় সরবরাহের অভাব এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
জেরজাভি জানান, যুদ্ধের সময় অনেক সময় প্রাণীদের টিকিয়ে রাখতে তারা বাধ্য হয়ে সীমিত খাবার বা অস্বাভাবিক খাদ্যও ব্যবহার করেছেন। তবে নিকটবর্তী এলাকায় বোমা হামলায় অনেক পশু মারা গেছে।
তিনি আরও বলেন, বারবার বাস্তুচ্যুতি এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করেছে, কারণ পরিবারগুলো পালাতে গিয়ে পশুর যত্ন নিতে পারেনি এবং অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে সেগুলো বিক্রি বা জবাই করেছে।
তার ভাষায়, শেষ পর্যন্ত পরিবার ও সন্তানদের বাঁচানোর চাপে পশুর যত্ন নেওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
‘ঈদ নেই’
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে গাজা উপত্যকায় ভেড়া ও ছাগলের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ হাজার। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ হাজারে। বাছুর ও অন্যান্য গবাদি পশুর সংখ্যা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানান, অধিকাংশ ভেড়া ও ছাগল এখন যাযাবর পশুপালকদের হাতে রয়েছে, ফলে ঈদের মৌসুমে সেগুলো বিক্রির জন্য সহজলভ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, পানি কূপ ও কৃষি অবকাঠামো চালু রাখতে না পারার কারণে প্রাণিসম্পদ খাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে। ফলে এই খাতের দ্রুত পুনরুদ্ধারের কোনো বাস্তব সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতির কারণে হাজার হাজার পরিবার এবার ঈদের কোরবানি পালন করতে পারছে না।
গাজার অনেক বাসিন্দার কাছে ঈদ এখন প্রায় অচেনা হয়ে গেছে। গাজা সিটির স্কুল শিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন, মনে হচ্ছে আমরা তিন বছর ধরে ঈদ পালন করিনি।
তিনি আরও বলেন, ঈদের মূল অনুভূতি ত্যাগ ও ভাগাভাগি— এখন আর নেই। এখন ত্যাগ বা ভাগ করার মতো কিছুই নেই।
তার মতে, সংকট শুধু পশুর অভাবেই সীমাবদ্ধ নয়, অনেক পরিবার এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেকে দৈনন্দিন খাবারই ঠিকমতো পাচ্ছে না, কেউ কেউ এক বছরের বেশি সময় ধরে হিমায়িত মাংসও খেতে পারেনি।
জাতিসংঘ সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ গাজার প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল।
যুদ্ধবিরতি থাকলেও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, অবরোধ ও মানবিক সহায়তার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ অনিয়মিত এবং দামও অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে।
স্থানীয়দের মতে, গবাদি পশুর ওপর বিধিনিষেধ শুধু ঈদের ঐতিহ্যই নয়, পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তাদের মতে, গবাদি পশু ও সংশ্লিষ্ট খাত সচল থাকলে পশুপালক, কৃষক, কসাই, রেস্তোরাঁ মালিকসহ বহু মানুষের জীবিকা টিকে থাকত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অর্থনৈতিক চক্র ভেঙে পড়েছে।
/ইউএমএইচ