বাংলাদেশের আপামর জনতার ম্যাডাম : বাংলাদেশের মানুষ যখন ‘ম্যাডাম’ শব্দটি উচ্চারণ করেন, তখন প্রায় সবার মনে ভেসে ওঠে এক অনন্য মুখ। তিনি দেশভক্ত, দৃঢ়চেতা, আপসহীন এবং জনগণের হৃদয়ে অমলিন একজন নেতা- বেগম খালেদা জিয়া। তার তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া, কোনো নির্বাচনে কখনো কোনো আসন থেকে পরাজয় না দেখা এবং কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও স্থিতিশীল নেতৃত্ব প্রদানের কারণে তিনি এক বিরল ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করেন। রাজনীতির অঙ্গনে এমন ব্যক্তিত্ব খুব কমই দেখা যায়, যার তুলনা করতে গেলে শেষ পর্যন্ত আবার তাকেই উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করাতে হয়। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই, তার তুলনা তিনি নিজেই।
আমার ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম সৌভাগ্যের ঘটনা হলো, এই বিরল গুণের অধিকারী, দৃঢ়চেতা ও আপসহীন অথচ সৌম্য ব্যক্তিত্বের এক মহীয়সী নেত্রীকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমি পেয়েছিলাম।
ম্যাডামের জীবনযাপন ছিল সহজ-সরল। তিনি ছিলেন স্বল্পাহারী মানুষ। সফরে গেলে বেশি আইটেমের খাবার তিনি পছন্দ করতেন না। পরিধানের পোশাক-পরিচ্ছদ বা শাড়িও খুব বেশি দামি বা অসাধারণ ছিল না। তবে তিনি যাই পরতেন তাই ওনাকে মানাতো এবং রাজকীয় মনে হতো। বেশিরভাগ শাড়িই ছিল পুরোনো। পাঁচ বছরে আমি কখনো ম্যাডামকে নতুন শাড়ি কিনতে দেখিনি। তবে তিনি শাড়ির যত্ন নিতেন। মোড়ায় বসে গামলায় সাবান পানি নিয়ে নিজেই শাড়ি কচলে পরিষ্কার করতেন। আরেকটা কাজ নিজের হাতে করতেন; সেটা হচ্ছে ড্রইংরুম গোছানো। গুলশান অফিসে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ম্যাডামের চেম্বারের পাশের কক্ষটা সাজানো হলো। ম্যাডামের নির্দেশনা অনুযায়ীই সব আসবাবপত্র সংগ্রহ করে সাজানো সম্পূর্ণ করা হলো। কিন্তু শেষদিন দেখা গেল ম্যাডাম নিজে পুরো কক্ষ ঘুরে ঘুরে সবকিছু নিজ হাতে একটা একটা করে নতুনভাবে সাজিয়ে দিলেন। বাসার ড্রইংরুমও তিনি নিজে গোছাতেন। তিনি উজ্জ্বল আলো পছন্দ করতেন না। টেবিল ল্যাম্পের হাল্কা আলো ম্যাডামের পছন্দ। ম্যাডামের রুচিবোধ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও অভিজাত। ওনার হাতে অতিসাধারণ বস্তুও রাজকীয় মনে হতো।
ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৬, মঈনুল হোসেন রোডের বাসা থেকে ম্যাডামকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করার কিছুদিন পর ওই বাসার মালামাল আনার হুকুম পাওয়া গেল। তালিকা করা হলো কারা সেখানে যাবে মালামাল আনার জন্য। সিএসএফ প্রধান অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মজিদ (বর্তমানে প্রয়াত), বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস, আমিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মিস্ত্রি এবং গৃহকর্মী যারা ওই বাসায় বসবাস করত এমন মোট পঞ্চাশজনের নামের তালিকা প্রস্তুত হলো।
সেনানিবাসের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন ম্যাডামের সঙ্গে এসএসএফের পূর্বে ডিজি হিসেবে কাজ করেছেন মেজর জেনারেল ফাতমী আহমেদ রুমী। সেনানিবাস থেকে তালিকা ছোট করে ২৫ জনে নামাতে বলা হলো এবং কর্নেল মজিদ ও শিমুল বিশ্বাসকে সেনানিবাসে ব্রাত্য ঘোষণা (পিএনজি) করায় তাদেরও সেনানিবাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো।
বলা হলো, প্রয়োজন হলে সেনানিবাস থেকে জনবল সহায়তা দেওয়া হবে। এপিএস সুরাতুজ্জামানের দায়িত্ব ছিল সেনানিবাস থেকে পাঠানো মালামাল রিসিভ করা। লোকবল কম পড়ায় ওকে আমার সঙ্গে নিয়ে নিলাম। ম্যাডামের পক্ষে ওনার দুই ভ্রাতৃবধূ, দুই মামি আমাদের গাইড করার জন্য সঙ্গে গেলেন। ম্যাডামকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় পুরো দেশবাসী তখনো স্তম্ভ। ম্যাডাম কিন্তু পরের দিন থেকেই সব মেনে নিয়ে ছিলেন। ঠাঁই নিলেন ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দরের বাসায়। আমরা মালামাল আনার বাকি প্রস্তুতি শেষ করলাম। মালামাল সাময়িকভাবে রাখার ব্যবস্থাও করা হলো। মালামাল নিয়ে ম্যাডামের তেমন আগ্রহ দেখা গেল না। শেষ বেলায় ম্যাডাম বললেন, শহিদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত প্রায় চল্লিশ বছরের ব্যবহৃত পুরোনো ড্রেসিং টেবিলটা যেন আমরা নিয়ে আসি। আমি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে এটা নোট করলাম। পরে ওই বাড়িতে গিয়ে প্রথমেই আমি ম্যাডামের বেডরুমে ড্রেসিং টেবিল খুঁজতে গেলাম। আমার ধারণা ছিল, না জানি কেমন অসাধারণ ও দামি কোনো ড্রেসিং টেবিল দেখতে পাব। পরে ড্রেসিং টেবিলটা দেখে হতাশ হলাম! বাংলাদেশের সবচেয়ে গ্ল্যামারাস প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খ্যাত সৌন্দর্যের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া নাকি প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এ রকম একটা পুরোনো রংচটা সাধারণ টেবিল ব্যবহার করেন!! পরে বুঝলাম, এটার কদরের মূল কারণ দামে বা মানে নয়, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মহামূল্যবান দুর্লভ স্মৃতি। আর এক স্বামীর ভালোবাসা।
এক মহামূল্যবান ফোন কল : ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। রাত প্রায় পৌনে ১১টা। আমি তখন বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম, হঠাৎ মোবাইল ফোনের রিং। রাতের নিঃশব্দতা ভেঙে গেল। ফোন ধরতেই শুনলাম পরিচিত কণ্ঠ : ‘আমি শিমুল বিশ্বাস বলছি। ম্যাডাম আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।’
ম্যাডাম শব্দটি শুনে যেন সারাশরীরে হিমবাহ বয়ে গেল। আমি তখন পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। চিন্তাশক্তি লোপ পেয়ে গেল। কখন যেন তড়াক করে বিছানাতেই উঠে বসলাম। ফোনে ভেসে এলো এক শান্ত, স্থির অথচ শক্তিশালী কণ্ঠ।
‘কেমন আছেন?’
আমি বললাম, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ম্যাডাম। ভালো আছি।’ তারপর তিনি বললেন, ‘জানেন তো, আমি বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব নিয়েছি। একজন পিএস নিতে চাই। সবাই আপনার কথা বলছে।’
মুহূর্তটা যেন স্বপ্নের মতো। ঘোরের মধ্যে কী বলছিলাম তা যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। আমার মুখ দিয়ে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে গেল, ‘ম্যাডাম, আপনি আমাকে তুমি করে বলুন।’
আমার কথা শুনে তিনি কয়েক সেকেন্ড নীরব রইলেন। তারপর আবার কথা শুরু করলেন- কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনি আবারও আমাকে ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করলেন।
পরবর্তী পাঁচ বছরেও এই সম্বোধনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তিনি কখনো আমাকে ‘পিএস সাহেব’ বলেননি- সবসময় বলতেন ‘সালেহ সাহেব’। বড় হোক বা ছোট- সবাইকে সমান মর্যাদা দেওয়ার তার নৈর্ব্যক্তিক আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে যা চিরকাল মনে থাকবে। ম্যাডাম আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমি আপনার নামে ডিও লিখব। লেখার আগে জানা প্রয়োজন আপনার সম্মতি আছে তো?’
আমার মাথায় তখন ঝড়ের গতিতে আওয়ামী লীগের নিগ্রহের চিত্র ফ্ল্যাশব্যাকে মনে পড়তে শুরু করেছে। ওরা এমনিতেই আমাকে ঢাকার বাইরে বরগুনা জেলা পরিষদে বদলি করেছে। এখন আমাকে আবার কোন বিপদে না ফেলে! কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে এক সেকেন্ডেরও কম সময় নিলাম। ম্যাডামকে বললাম, ‘ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে কাজ করা আমার জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের ব্যাপার। আপনি ডিও লেখেন। অর্ডার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি চলে আসব।’
সৌজন্য ও মানবিকতা : দুজন খ্যাতনামা সাংবাদিকের কাছ থেকে পৃথকভাবে আমি তার অসাধারণ সৌজন্যতার গল্প শুনেছি। তারা দুজনই বলেছিলেন, সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তারা বিস্মিত হয়েছিলেন তার ভদ্রতা, ধৈর্য, সম্মানজনক ও অভিজাত আচরণ দেখে। তারা উভয়ই পরবর্তী জীবনে ম্যাডামের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে পড়েন।
ম্যাডামের পিএস থেকে আমি যখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি হয়ে ফিরে এলাম, পরবর্তীতে অবসর পর্যন্ত আমি আর কখনো কোনো পোস্টিং বা পদোন্নতি পাইনি। ওই দুজন সাংবাদিক আলাদাভাবে একই মন্তব্য করেছিলেন- ‘আপনি যে মহান ব্যক্তির সঙ্গে পাঁচ বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, বাকি জীবনে আর পোস্টিং না হলেও আপনার আফসোস করার কিছু নেই।’
সেই কথাটি আমি বহুবার স্মরণ করেছি এবং সত্যিই অনেক সান্ত্বনা পেয়েছি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো- ম্যাডামের সঙ্গে পরবর্তীতে যখনই দেখা হয়েছে, তিনি আন্তরিকভাবে জানতে চেয়েছেন আমার কোনো পোস্টিং হয়েছে কি না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সচিব পদে নিযুক্ত হওয়ার সুযোগ পাই। আমি ম্যাডামের কাছের একজনের মাধ্যমে আমার সচিব পদে যোগদানের অনুমতি প্রার্থনা করি। তিনি শুনে বলেছিলেন, ‘আমার একটা ছেলের চাকরিতে নিয়োগ হয়েছে- এটা আমার জন্য অনেক খুশির খবর। ওকে জয়েন করতে বলো।’ এই একটি বাক্য আমার জীবনের বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি হয়ে আছে।
অসাধারণ ব্যক্তিত্ব : ম্যাডামের ব্যক্তিত্ব ছিল সত্যিই আকাশচুম্বী। অনেক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকেও দেখেছি তার সামনে কথা বলতে গিয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়তে। একবার অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের একটি দল তার সঙ্গে দেখা করতে এলো। তারা আগেই আলোচনা করে একটি সুসজ্জিত বক্তব্য প্রস্তুত করেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল দীর্ঘ আলোচনা হবে। দলনেতা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বক্তব্য শুরু করলেন। ম্যাডাম মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর তিনি একটি মাত্র প্রশ্ন করলেন। প্রশ্নটি শোনার পর কক্ষে এক ধরনের নীরবতা নেমে এলো। উপস্থিত সবাই একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলেন, কিন্তু আর কেউ কথা বলতে পারলেন না। এমন দৃশ্য আমি বহুবার দেখেছি। তার চোখ এবং মন সবসময় সক্রিয় থাকত।
স্মরণশক্তির বিস্ময়কর ক্ষমতা : একজন সফল রাষ্ট্রনায়কের যে গুণটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হলো স্মরণশক্তি। ম্যাডামের ক্ষেত্রেও এটি ছিল বিস্ময়কর। দেশের বিভিন্ন জেলায় ম্যাডামের নেতাকর্মীর কোনো অভাব ছিল না। ছবি দেখেই তিনি তাদের নাম বলে দিতে পারতেন। কোনো অনুষ্ঠানে হয়তো তিনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে আছেন; দেখে মনে হতো ম্যাডাম হয়তো কিছুই মনোযোগ দিয়ে দেখছেন না। কিন্ত অনুষ্ঠানের শেষে সবাইকে চিহ্নিত করতে পারতেন- কে উপস্থিত, কে অনুপস্থিত। এই ক্ষমতা আমাকে সবসময় বিস্মিত করেছে।
মোবাইল ও টাকা : বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান অনুষঙ্গ দুটো, মোবাইল আর টাকা। এ দুটো ছাড়া মানুষের চলাচল যেন একরকম অসম্ভব। বেগম খালেদা জিয়ার হাতে এ দুটো কখনোই কেউ দেখেনি। আমি যতবার ম্যাডামকে নিয়ে বিদেশে গেছি আমার কাছে ডলার রাখা হতো। ওনার অনুমতি নিয়ে খরচ করতাম এবং হিসাব নোট করে রাখতাম। হিসাব দিতে চাইলে বলতেন, পরে দেশে ফিরে দেবেন। ম্যাডামের নিজস্ব কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। মোবাইলে কথা বলার প্রয়োজন হলে আমরা যারা কাছে ছিলাম তাদের ফোনে কথা বলতেন।
ছোট আনন্দের মুহূর্ত স্টারবাকের কফি : দেশের বাইরে ম্যাডামকে নিয়ে আমার প্রথম যাওয়া সৌদি আরব। কোনো একটা অনুষ্ঠানে আমরা ম্যাডামের সঙ্গে বাইরে গেছি। কিছুক্ষণ আমাদের ওখানে অপেক্ষা করতে হবে। কাচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে পাশেই স্টারবাক। ব্যক্তিগত ক্যামেরাম্যান নুরুদ্দিন ভাই ম্যাডামের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থা হতে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছেন। অনেক কিছু জানেন। নুরু ভাই কানে কানে বললেন, ম্যাডাম স্টারবাকের কফি খুব পছন্দ করেন। আমি বললাম, কফি নিয়ে আসব? ম্যাডাম তো কিছু বলছেন না, আনার পর যদি রাগ করেন? নুরু ভাই বললেন, ‘উনি কখনো নিজে থেকে কিছু চান না।’ পরে সাহস করে এক কাপ ক্যাপুচিনো নিয়ে তার কাছে ধরলে, তিনি মৃদু হাসলেন এবং কাপটি হাতে নিলেন। সেই হাসিটা আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। নিজের কোনো চাহিদা কারও কাছে প্রকাশ না করাও ছিল ম্যাডামের ব্যক্তিত্বের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
সর্বজনীন জনপ্রিয়তা ও জাতীয় নেতৃত্বের গুণ : ম্যাডাম কেবল একটি দলের নেত্রী নন; দলীয় নেতৃত্বের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি সারা জাতির আস্থার প্রতীক হিসেবে জাতীয় নেত্রীর মর্যাদা অর্জন করেছেন। তার প্রমাণ হিসেবে একটা ঘটনার কথা বলছি। শেখ হাসিনার স্বামী ওয়াজেদ সাহেব মারা গেছেন। অন্যদিনের মতো সেদিনও সন্ধ্যায় ম্যাডাম গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এলেন। ওনার কক্ষে আমার ডাক পড়ল। ম্যাডামের কক্ষে প্রেস সেক্রেটারি মারুফ কামাল খান, সোহেল ভাই ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ছিলেন। ম্যাডাম আমাকে বললেন যে তিনি ওয়াজেদ সাহেবের মরদেহ দেখতে সুধাসদনে যেতে চান। আমি যেন যোগাযোগ করি। আমি আমার কক্ষে ফিরে এসে প্রথমেই প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনার) পিএস-১ নজরুল ইসলাম খানকে ফোন করি। পরপর কয়েকবার ফোন করার পরও তিনি ফোন ধরলেন না। এরপর এপিএস-১ এবং এপিএস-২ কেও কয়েকবার ফোন করে গলদঘর্ম হয়েও কারও উত্তর পেলাম না। শেষ পর্যন্ত পিএস-২ সেলিনা খাতুনকে পেলাম। তিনি আমার কথা শুনে বললেন, ‘ভাই, ব্যাপারটা আপনার-আমার পর্যায়ের না, বুঝতেই তো পারছেন। আমি আলাপ করে আপনাকে জানাচ্ছি। পাঁচ মিনিট সময় দেন।’
ততক্ষণে ম্যাডামের রুমে আবার আমার ডাক পড়ল। আমি ম্যাডামকে জানালাম যে প্রধানমন্ত্রীর পিএস পাঁচ মিনিট সময় নিয়েছে। এ কথা শুনেই মারুফ কামাল ভাই চেয়ার থেকে দাঁডিয়ে পড়লেন এবং বললেন, ‘ম্যাডাম, আমি জানতাম ওরা আপনাকে ওখানে যেতে অ্যালাউ করবে না। আমি এখুনি টিভি স্ক্রলে দিয়ে দিচ্ছি, ওরা আপনাকে ওখানে যেতে অ্যালাউ করছে না।’ ম্যাডাম তার স্বভাবসুলভ শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘সোহেল, এখুনি এটা প্রেসে দেওয়ার কী দরকার! পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো। পরে যদি ওরা আমাকে যেতে বলে তখন কেমন হবে ব্যাপারটা!’
একটু পরেই সেলিনা খাতুন জানালেন যে, মরদেহ মরচুয়ারিতে নিয়ে যাওয়া হবে। আমরা যেন তাড়াতাড়ি যাই। আমাদের সবরকমের প্রস্তুতি ছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ধানমন্ডিতে সুধাসদনে পৌঁছে যাই। ওয়াজেদ সাহেবের মৃত্যুর সংবাদে সুধাসদনের বাইরে তখন অনেক নারী-পুরুষের ভিড়। ম্যাডামকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ম্যাডামের ফেরার অপেক্ষায়। তখন অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, আওয়ামী লীগের সমর্থক বেশ কয়েকজন নারী মৃত্যু শোক ভুলে গিয়ে ম্যাডামকে দেখার জন্য উৎসুক হয়ে আছে। কয়েকজনকে মুখেও বলতে শুনলাম, ‘খালেদা জিয়া নাকি এসেছে, চল দেখি।’ সেদিন জানতে বাকি রইল না যে বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী সমর্থকদের মাঝেও কতটা ক্রেজ!
আরেকটা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি, ম্যাডাম যখন টঙ্গীর ইজতেমায় মোনাজাতে যেতেন। ইজতেমায় ম্যাডামের বসার ব্যবস্থা করা হতো এটলাস কোম্পানির একটি ভবনের ছাদে শামিয়ানা টাঙিয়ে। মোনাজাত শেষ হলে সবাই একযোগে ঢাকায় ফিরত। ম্যাডামের গাড়িবহর দেখে লোকজন যখন টের পেত যে ম্যাডাম ফিরছেন তখন সবাই ম্যাডামের গাড়িকে ঘিরে গাড়ির সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে আসত। ম্যাডামের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও উৎসুক দেখে ভাবতাম, সরকার ম্যাডামের নিরাপত্তা দিতে কার্পণ্য করলেও এ দেশের জনগণই ম্যাডামের বড় নিরাপত্তা।
ম্যাডাম শুধু একটি দলের অবিসংবাদিত নেত্রী নন; তিনি দলমতের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে সারা জাতির আস্থা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে এক সর্বজনস্বীকৃত জাতীয় নেতার মর্যাদা অর্জন করেছেন। তার নেতৃত্বে দেশ, দল এবং মানুষ- সবকিছুর প্রতি দায়িত্ববোধ, দৃঢ়তা এবং মানবিকতা মিলিত হয়েছে।
লেখক : সিনিয়র সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়
সময়ের আলো/জেডআই