বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য নিয়ে বাঁচার তাড়নাটি তীব্রতর হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে বেঁচে থাকাও মহান আল্লাহ তায়ালার অন্যতম একটি ইবাদত। কিন্তু আমরা এমন এক বাস্তবতায় বাস করছি, যেখানে বিপুলসংখ্যক রাজনীতিকের মধ্যে বিভক্তির রাজনীতি জিইয়ে রাখার এক প্রচণ্ড আসক্তি লক্ষ করা যায়। আর এই আসক্তির কারণেই নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের নামে বিভক্ত রাজনীতি আজ সমাজে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করছে।
এই বিভাজনের প্রভাবে রাজনীতিতে ঠিক কতটুকু বিচ্যুতি ঘটেছে, তা বুঝতে কোনো গভীর গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না; সমাজে বিদ্যমান বিভক্তির মাত্রা দেখলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কারণ বিভক্তির আসল অর্থই হলো মানবকল্যাণ থেকে বিচ্যুতি ঘটা। শুধু তা-ই নয়, সমাজে এই বিভক্তির রাজনীতি অনিবার্যভাবে শত্রুশক্তির তোষামোদি করার পথ তৈরি করে দেয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে এই বিভক্তির এক বড় দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯১৭ সালে সেক্যুলার আরবগণ ব্রিটিশ ও ফরাসিদের সহায়তা নিয়ে তাদের অখণ্ড আরব ভূমিকে খণ্ডিত করে ২২টি টুকরোয় বিভক্ত করেছিল। পবিত্র কুরআনের সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট বলা আছে- ‘আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং নিদর্শনগুলো আসার পরও বিরোধিতা করতে শুরু করেছে, তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর আজাব।’
বিভক্তি নিয়ে কখনো কোনো জনগোষ্ঠীর পক্ষে একটি সফল রাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব নয়; বড়জোর একা একটি ঘর তৈরি করা সম্ভব। একটি কল্যাণ রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভক্তি বাদ দিয়ে ঐক্যের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
ঐক্যের মাধ্যমে বৃহৎ রাষ্ট্র গড়ে তুলে বিশ্বজনীন সংস্কৃতি তৈরি হয়, আর ঐক্যের অভাবে জন্ম নেয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র, যা মূলত বিভক্তির সংস্কৃতিকেই ধারণ করে।
বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র দেশ হওয়াতে বাংলাদেশিদের মাঝে অবচেতন মনে এক ধরনের ক্ষুদ্র চেতনা প্রবলভাবে কাজ করে। তাদের চিন্তা-চেতনায় সবার আগে বাঙালি ও বাংলাদেশ স্থান পেলেও, প্রতিবেশী ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিয়ে কাক্সিক্ষত ভাবনা থাকে না। অথচ বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রের সারিতে দাঁড় করাতে হলে রাজনৈতিক ঐক্যের পাশাপাশি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। বস্তুত ঐক্যের বিকল্প কেবলই ঐক্য।
মহান আল্লাহ তায়ালা শত্রুশক্তির কর্তৃত্ব থেকে আমাদের বাঁচাতেই ঐক্যবদ্ধ থাকার আদেশ দিয়েছেন এবং বিভক্তিকে সম্পূর্ণ হারাম করেছেন।
নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে বাঁচতে হলে অন্য সব সংগ্রামের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যিক। অনৈক্যের কারণে অতীতে আমাদের মাঝে বারবার সংকট এসেছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে আমাদের রাজনীতিকরা কখনো চান না। বরং তাদের মাঝে অনৈক্য ও বিদ্রোহ করার আগ্রহই দিন দিন বেড়েছে।
স্বাধীনতার পর যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল জাতীয় ঐক্যের, তার পরিবর্তে প্রতিনিয়ত কেবলই বিভক্তি ঘটেছিল।
এই রাজনৈতিক বিভক্তি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে আমাদের মধ্যে ঐক্য রক্ষায় সম্পূর্ণরূপে আন্তরিক ছিলেন শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। কারণ তিনি সবসময় একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি চেয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, ঐক্যবদ্ধ জাতি ছাড়া কখনো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়।
তার ‘১৯-দফায়’ শেষ দফা ছিল ‘জাতীয় ঐক্য ও সংহতি’ পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে সব ধরনের বিভক্তি ও বৈষম্য কমিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য দুটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি- একটি হলো দেশপ্রেম, অপরটি আত্মত্যাগ।
বর্তমান সময়ে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের সেই আদর্শ নিয়ে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের মানসিকতায় জাতীয় চেতনার উন্মেষ তৈরি করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তাই আজ আমাদের জাতীয় জীবনে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের নীতি বড় বেশি প্রয়োজন।
আসুন, আমাদের ক্ষতবিক্ষত জীবনে, আমাদের মনে ও চিন্তায় তার নীতিকে ধারণ করি; রাজনৈতিক বিভক্তি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে একটি প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করি।
লেখক পরিচিতি : রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
/এসএকে