মজুদদারে দামে উত্তাপ গরম মসলার

সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম

সারাদেশ

কুরবানির ঈদ সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জে মসলার দামে ছড়াচ্ছে উত্তাপ। এপ্রিলের শেষ সময় পর্যন্ত মূল্য পরিস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। মে

2026-05-25T05:29:06+00:00
2026-05-25T05:31:10+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
মজুদদারে দামে উত্তাপ গরম মসলার
সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ৫:২৯ এএম  আপডেট: ২৫.০৫.২০২৬ ৫:৩১ এএম
কুরবানির ঈদ সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জে মসলার দামে ছড়াচ্ছে উত্তাপ। ছবি : সময়ের আলো
কুরবানির ঈদ সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জে মসলার দামে ছড়াচ্ছে উত্তাপ। এপ্রিলের শেষ সময় পর্যন্ত মূল্য পরিস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। মে মাসের শুরুতে দাম বাড়তে থাকে। মাঝামাঝি সময়ে এসে পাল্টে যায় মূল্য পরিস্থিতি। এখন এলাচের দাম বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। 

চার দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি ভালো মানের এলাচের দাম পাইকারিতে ৪ হাজার ৯০০ টাকায় ঠেকেছে। আর খুচরায় ‘এক নম্বর এলাচ’ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি সাড়ে ৫ হাজার টাকায়। এলাচের প্রতি কেজি দাম ছয় হাজারে পৌঁছার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জিরা লবঙ্গের দামও বাড়তির দিকে। 

পাইকার ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন পেঁয়াজ রসুন আদার দাম কমছে। বাস্তবে খুচরা পর্যায়ে পাইকারদের দাবির সত্যতা মেলেনি। শুক্র-শনিবার খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, পেঁয়াজ ছাড়া সব ধরনের মসলার দাম ঊর্ধ্বমুখী। 

কাস্টমসের পরিসখ্যান বলছে, মসলার আমদানি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয়। কুরবানকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে মসলার দাম বাড়ানো হচ্ছে। 

এদিকে ব্যবসায়ীদের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা ঠেকাতে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন অভিনব বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। শুক্রবার গণমাধ্যমে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কিছু ব্যবসায়ী এলাচ পাম তেলসহ ভোগ্য পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। বহিরাগত ব্যবসায়ীরা নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে এলাচ বিক্রি করছে। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সমস্যা হচ্ছে। 

কুরবানির মাংসসহ বিভিন্ন রান্নার উপকরণ তৈরি করতে মরিচ, হলুদ ও ধনিয়া ব্যবহার হয়ে আসছে। সঙ্গে ব্যাপক ব্যবহার হয় চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি ও গোলমরিচ। সবগুলোকে এক সঙ্গে গরম মসলা নামে অবহিত করা হয়। চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, গোলমরিচের চাহিদা সারা বছর থাকে। কুরবানির সময় চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কুরবানির সময়কে বাড়তি দাম নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন কিছু পাইকার ব্যবসায়ী। 

আমদানি বেশি থাকলেও সংকট তৈরি করার অভিযোগ বহু পুরোনো। ব্যবসায়ীদের সংঘবদ্ধ একটি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি মসলার বাজার। কুরবানকেন্দ্রিক মসলার বাজার নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তুতি শুরু হয় অন্তত তিন থেকে চার মাস আগে থেকে। বিশাল মজুদ থাকলেও দাম বাড়তেই থাকবে। এবার সাধারণ ক্রেতাদের শঙ্কা কুরবানির আগের দিন পর্যন্ত এলাচসহ মসলার চড়া দাম বাড়বে। 

চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, মসলার আমদানি কম হয়েছে বলা যাবে না। এলাচ ও জিরাসহ মসলা জাতীয় পণ্য বেশ ভালো আমদানি হয়েছে। কিছু মসলা চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়েও আমদানি হচ্ছে। সমুদ্রবন্দরের চেয়ে স্থলবন্দরে মসলা আমদানি বেশি হয়। তবে আমদানিতে কোনো সংকট নেই।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই ২৫ থেকে চলতি ১০ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এলাচ আমদানি হয়েছে ১ হাজার ১৫০ টন, দারুচিনি ১৩ হাজার ২৯৬ টন, লবঙ্গ ১ হাজার ৩৫০ টন, জিরা ৩ হাজার ১১৫ টন, জয়ত্রী ৩৫০ টন, জায়ফল ৩৩৬ টন, গোলমরিচ ১ হাজার ৯৫৯ টন, আদা ৪৫ হাজার ৫৩৮ টন ও রসুন ৫৩ হাজার ১০১ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একই সময়ে এলাচ এসেছিল ১ হাজার ৮৪৬ টন, দারুচিনি ১৫ হাজার ৭৩৯ টন, গোলমরিচ ১ হাজার ৬৫৯ টন। 

অপরদিকে চলতি অর্থবছরে মে পর্যন্ত আদা আমদানি হয়েছে ৬২ হাজার ৩৯৪ মেট্রিকটন। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদা আমদানি হয় ৩৮ হাজার ৫৪৭ মেট্রিকটন। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ২৩ হাজার ৮৪৭ মেট্রিকটন বেশি আদা আমদানি হয়েছে। 

খাতুনগঞ্জে মূল্য পরিস্থিতি যাচাই করে দেখা যায়, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও পাইকারি বাজারে চায়না আদা প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। সেই আদার দাম বেড়ে কয়েক দিন আগেও ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হয়। 

পাইকার ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, দুদিন (শুক্র-শনিবার) পেঁয়াজ রসুন আদার দাম কমেছে। রসুন প্রতি কেজি ৯৫ থেকে ১০০ টাকা, আদা প্রতি কেজি পাইকারিতে সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে খুচরায় মানভেদে প্রতি কেজি আদা ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। বর্তমানে পাইকারি বাজারে চায়না রসুন ১৩০ টাকা, দেশি রসুন ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং পেঁয়াজ ২৫ থেকে ৩৩ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। তবে খুচরায় এসব পণ্য কেজিতে ২০/৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। 

খাতুনগঞ্জের হামিদল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস সময়ের আলোকে বলেন, বেশি দামে আমদানি করা আদা গেল কয়েকমাস আমরা কম দামে বিক্রি করেছি। দাম কমে যাওয়ায় অনেকে আমদানির জন্য ব্যাংকে এলসি খুলেনি। এখন বাজারে পাইকারদের হাতে আদার মজুদ কম। তাই প্রতি কেজি পাইকারি বা খুচরায় দাম কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু শুক্রবার-শনিবারের চিত্র ভিন্ন। পেঁয়াজ রসুন আদা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। এতে আমরা লোকসান গুনছি।

নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার মেসার্স আরজু স্টোরের ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, দাম কমেছে মনে হচ্ছে না। এই মুহূর্তে পেঁয়াজ ছাড়া সব ধরনের মসলা জাতীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এলাচের দাম প্রতি কেজি এখনই বিক্রি হচ্ছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। আমার ধারণা কুরবানির দুয়েক দিন আগে প্রতি কেজি ছয় হাজার টাকা হতে পারে।

ব্যবসায়ী সমিতির অভিনব বিজ্ঞপ্তি : খাতুনগঞ্জের আমদানিকারকসহ সব ধরনের পাইকার ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করে একটি সংগঠন। এটি খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন নামে পরিচিত। সেই সংগঠনের পক্ষ থেকে শুক্রবার গণমাধ্যমে একটি অভিনব বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়েছে। 

সংগঠনের মতে বহিরাগত ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিষয়ে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুর রহমান স্বাক্ষরিত সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কিছু অসাধু ও বহিরাগত ব্যবসায়ী নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ডিও স্লিপের মাধ্যমে এলাচ, পাম তেলসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। যা অনেক ব্যবসায়ী আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। 

তাই সব এলাচ, পাম তেলসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে খাতুনগঞ্জে যে সব ব্যবসায়ী নিয়মশৃঙ্খলা ও সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করেন তাদের সঙ্গে লেনদেন করার জন্য খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলো।

প্রসঙ্গত গত ১৯ মে খাতুনগঞ্জে বহিরাগত ভাসমান ব্যবসায়ীদের এলাচসহ বিভিন্ন পণ্য কথিত বেপরোয়া ট্রেডিংয়ের বিষয়ে ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। সংগঠনভুক্ত পুরোনো ব্যবসায়ীরা একটি চিঠিও দেন সংগঠন বরাবর। সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, খাতুনগঞ্জ বাজারে বহিরাগত ভাসমান ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া এলাচ ব্যবসা করছে। তাদের কারণে বৈধ মসলা আমদানিকারকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। 

এসব কথিত মসলার ব্যবসায়ীদের কারও অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ নেই। তারা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে এলাচ কেনাবেচা করছেন। এ ক্ষেত্রে তারা বাজারের প্রচলিত আড়তদারি প্রথা ও ট্রেড রুলস তোয়াক্কা করছেন না। এই বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার কারণে ইতিমধ্যেই বাজারে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। যা বৈধ আমদানিকারকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি ব্যবসায়ীদের স্বার্থে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, নিজেদের কাছে পণ্য নেই। তারা আবার ডিউ ব্যবসার নামে পণ্য বিক্রি করছে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মূলত তাদের রক্ষায় এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডিউ ব্যবসায়ী জানান, এই ধরনের বিজ্ঞপ্তি দিতে পারে না কোনো সংগঠন। ব্যবসায়ীরা নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করবেন। সেখানে সতর্কীকরণ নোটিস দেওয়ার কী আছে।

দাম বৃদ্ধির পরিকল্পনা হয় চার মাস আগে : ক্যাব
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) মনে করছে কুরবানির তিন থেকে চার মাস আগে মসলার মূল্য বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা মতে কুরবানির আগে ধাপে ধাপে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। যার খেসারত দেন সাধারণ ভোক্তারা।

ক্যাবের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরি সময়ের আলোকে বলেন, আমদানিকারক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। 

খাতুনগঞ্জের পাইকার ব্যবসায়ীরা দামে তারতম্যে বড় ভূমিকা পালক করে। প্রতি বছর কুরবানির অন্তত চার আগে পরিকল্পান করা হয় দাম বৃদ্ধির। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের মসলার দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আমাদের কাছে যে তথ্য আছে তাতে মসলার ঘাটতি নেই। বিশেষ করে এলাচের দাম কখনো প্রতি কেজি সাড়ে পাঁচ হাজার হতে পারে না।

/এসএকে


  বিষয়:   মজুদদার  দাম  উত্তাপ  গরম  মসলা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: