ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এখানে ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য নিয়তের শুদ্ধতার পাশাপাশি উপার্জন হালাল হওয়াও অপরিহার্য। কুরবানি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা আর্থিক ও শারীরিক ত্যাগের এক অনন্য সমন্বয়। প্রতি বছর জিলহজ মাসে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করেন।
কিন্তু বর্তমান সমাজে হালাল ও হারামের মিশ্রণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে- সুদ, ঘুষ ও বিভিন্ন অনৈসলামিক উপায়ে উপার্জিত অর্থ। যা জীবনের সর্বস্তরে প্রবেশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে হারাম সম্পদ দিয়ে কুরবানির বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি।
কুরবানি শব্দের অর্থ আল্লাহর নৈকট্য লাভ। শরিয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু জবাই করাই কুরবানি। তবে এর প্রকৃত তাৎপর্য পশু জবেহে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের অন্তরের পশুবৃত্তি, অহংকার ও দুনিয়াবিমুখতা ত্যাগ করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করাই এর মূল লক্ষ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া’। সুতরাং কুরবানির উদ্দেশ্য ভোগ বা প্রদর্শন নয়, বরং তাকওয়া অর্জন।
কুরবানি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর অনন্য ত্যাগের স্মারক এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের পরীক্ষা। একই সঙ্গে এটি সমাজে দরিদ্রদের সঙ্গে সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা সৃষ্টি করে। তবে এই ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য শর্ত হলো- উপার্জন অবশ্যই হালাল হতে হবে। সুদ, ঘুষ, আত্মসাৎ বা অন্য কোনো হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে কুরবানি করা জায়েজ নয় এবং তা কবুলও হবে না।
শরিয়তের দৃষ্টিতে যার সম্পদ সম্পূর্ণ হারাম, তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হয় না; বরং সেই সম্পদ প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া বা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দেওয়া আবশ্যক। আর যদি হালাল ও হারাম সম্পদ মিশ্রিত থাকে, তবে আগে হারাম অংশ আলাদা করতে হবে। অবশিষ্ট হালাল সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে তবেই কুরবানি ওয়াজিব হবে।
যৌথ কুরবানির ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। যদি কোনো শরিকের অধিকাংশ সম্পদ হারাম হয়, তবে তার সঙ্গে কুরবানি করা বৈধ নয়; এমনকি এতে অন্যদের কুরবানিও বাতিল হয়ে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। যে ব্যক্তির খাদ্য, পোশাক ও উপার্জন হারাম, তার দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
তাই কুরবানির আগে প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের উপার্জনের উৎস যাচাই করা, হারাম সম্পদ পরিত্যাগ করা এবং হালাল উপার্জনে অভ্যস্ত হওয়া। সামর্থ্য কম হলেও অল্প হালাল সম্পদ দিয়ে কুরবানি করা উত্তম; বিপরীতে বিপুল হারাম সম্পদ দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ কুরবানি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
কুরবানি কোনো উৎসবমাত্র নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির এক মহান মাধ্যম। তাই আসুন, আমরা আমাদের উপার্জনকে পবিত্র করি এবং খাঁটি নিয়ত নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানি আদায় করি। আল্লাহ সবাইকে তওফিক দান করুন।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা
/এসএকে