আপনার চারপাশের পৃথিবীটার দিকে তাকান একবার। চারপাশ মানে দৃষ্টিপথে দেখা চারপাশ নয়, বরং মানসনেত্রে দেখতে পাওয়া এক পৃথিবী। আপনি হয়তো কখনো উত্তর মেরুতে যাননি, সুতরাং প্রত্যক্ষ করেননি অরোরা বোরিয়ালিস বা মেরুজ্যোতি; কিংবা আপনার কখনো যাওয়া হয়নি দক্ষিণ আফ্রিকায় বা কেনিয়ায়, সুতরাং দেখা হয়নি হটেন্টট বা মাসাইদের সঙ্গে। এমন অনেক কিছুই তো আমাদের দেখা হয় না, কিন্তু এসব সম্পর্কে আমরা জানতে পারি আর মনের চোখে দেখতেও পাই। সেই দেখা আরও সহজ করে দিয়েছে এখনকার এই ইন্টারনেটের যুগ।
কাজেই গত ৭ জানুয়ারি মিনেসোটায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রেনি নিকোল গুড নামে ৩৭ বছর বয়সি এক ৩ সন্তানের মাকে কীভাবে গুলি করে মারল ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এজেন্ট, সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী না হয়েও আপনি পুরো ছবিটা দেখতে পাবেন টেলিভিশনে, খবরের কাগজে, নিউজ পোর্টালে, ফেসবুক-ইউটিউবে এবং অবশ্যই আপনার মানসনেত্রে।
কিংবা ধরুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার স্ত্রীসহ তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা; কিংবা আলোচনা চলার মধ্যেই আচমকা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলা এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে নেওয়া (তাতে অবশ্য স্বপ্ন পূরণ হয়নি ডোনাল্ড সাহেবের, উল্টো তিনি ফেঁসে গেছেন আর সবকিছু লেজেগোবরে করে এখন রাতদিন মিথ্যা বকে চলেছেন); কিংবা নিজের দেশের মুসলমানদের চটকানা দিয়ে আমিরাতে গিয়ে মুহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে গলাগলি করছেন নরেন্দ্র মোদি... না, থাক, এসব উদাহরণের বহর বাড়িয়ে কাজ নেই; মোদ্দা বিষয়টা তো আপনি বুঝতেই পেরেছেন, পৃথিবী নামে সৌরজগতের এই তিন নম্বর গ্রহটিতে মানব-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর কোথায় কী ঘটছে, ভূত-ভবিষ্যৎ তার সবই আপনি মনের চোখে দেখে নিতে পারেন কোনো প্রকার তন্ত্র-মন্ত্রের দোহাই না দিয়েই।
আর তন্ত্র-মন্ত্রের কথাই যখন উঠল, তখন আপনার মনে প্রথমেই নিশ্চয় গণতন্ত্রের কথা আসবে না- আসবে সাপুড়ের মন্ত্রের ভাবনা; এতে আপনার দোষ নেই, কম আর বেশি আমাদের সবার মনেই ঢুকে রয়েছে সাপুড়ের মন্ত্র। শৈশবকালে সাপখেলা আমরা কে না দেখেছি এবং রোমাঞ্চিত হয়েছি, বলুন! তারপর সাপে কাটা মানুষের বিষ ঝাড়তে তান্ত্রিক ওঝার তুকতাক মন্ত্র সম্পর্কেও তো আমরা ওয়াকিবহাল।
সুতরাং তন্ত্র-মন্ত্র বললে আপনার ভাবনায় এসব ঝিলিক দিয়ে গেলে যাক, ক্ষতি নেই, তবে ভাবনার একটু গভীরে গিয়ে তখন হয়তো বুঝবেন এই তন্ত্র বলতে গণতন্ত্রও হতে পারে। আপনার মানসজগৎ অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠবে গণতন্ত্র শব্দটি কর্ণগোচর হওয়া মাত্রই। গণতন্ত্র মানে প্রাচীন গ্রিস, গণতন্ত্র মানে ডেমোক্রিটাস-সক্রেটিস-প্লেটো। এথেন্সের সেই প্রাচীন মাটিই ছিল গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর। এখন যুগের পর যুগ পেরিয়ে এই আধুনিক রূপে পৌঁছেছে গণতন্ত্র। দেশে দেশে আজ তার প্রচুর সমাদর।
এর মধ্যে অনেক রকম তন্ত্রই দেখেছে মানবসমাজ। যেমন সমাজতন্ত্র, যেমন ফ্যাসিতন্ত্র, যেমন একনায়কতন্ত্র। এমন আরও কত কত তন্ত্র। কিন্তু কোনো তন্ত্রই ভালো লাগেনি মানবজাতির, ওইসব তন্ত্র আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তারা গণতন্ত্রকেই আঁকড়ে ধরেছে এবং গণতন্ত্রের জয়গানই গেয়েছে। দিক-দিগন্তে এখনও চলছে সেই জয়গান গাওয়া।
ঠিক আছে, গণতন্ত্রের পক্ষে থাকার এক হাজার একটা যুক্তি আছে আপনার। সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে কথা আছে একটা। সেই কথাটা বলেছিলেন কার্ল মার্কস আর ফ্রেডারিক এঙ্গেলস নামে দুই দাড়িওয়ালা জার্মান বুড়ো। পরে আবার তাদের কথা ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ নামে একটা বইতে বিশদে লিখে গেছেন ভ্লাদিমির উলিয়ানভ নামে রাশিয়ার এক লোক- দুনিয়ার মানুষ তাকে চেনে ‘লেনিন’ ছদ্মনামে।
যাই হোক, তাদের কথার সারমর্ম হচ্ছে- কোনো কিছুই শ্রেণি-ঊর্ধ্ব নয়। অর্থাৎ সবকিছুরই রয়েছে শ্রেণিচরিত্র এবং সবকিছুই শ্রেণিসাপেক্ষ। সবকিছুরই শ্রেণি আছে, যেহেতু সমাজ শ্রেণিবিভক্ত। এই বিবেচনায় গণতন্ত্রও শ্রেণি-নিরপেক্ষ কিছু নয়; গণতন্ত্রেরও রয়েছে শ্রেণিচরিত্র। খুব সহজভাবে কল্পনা করুন- শহরের বস্তিবাসী একজন দরিদ্র রিকশাচালক আর অভিজাত অট্টালিকাবাসী একজন ধনকুবের কি এক কাতারে পড়েন? উত্তর কী, আপনি জানেন। সুতরাং রিকশাচালকের গণতন্ত্র আর ধনকুবেরের গণতন্ত্র এক নয়।
তবু এক করে দেখানো হয়। আরও একবার পড়ুন, তবু এক করে দেখানো হয়। কেন জানেন? এখানে রয়েছে একটা শুভংকরের ফাঁকি। একালে গণতন্ত্র আসলে পুঁজিবাদ। গণতন্ত্র হলো সেই মন্ত্র যার সাহায্যে অতিদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, অভিজাত ইত্যাদি সব শ্রেণির মানুষের বিষ ঝাড়া যায়। ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এমন অনেক স্বাধীনতা পাওয়া যায় গণতন্ত্রে। ধনী হওয়ার স্বাধীনতাই বা ঠেকাই কে! মানুষ এসব স্বাধীনতা ভালোবাসে। নানারকম দল গঠন করা যায় গণতন্ত্রে। নির্বাচন করা যায়। ভোট দেওয়া যায়। এসবই মানুষের আকাক্সক্ষার বিষয়।
কিন্তু ওই যে শুভংকরের ফাঁকি- গণতন্ত্রের মোড়কে সবকিছুই আসলে পুঁজিবাদ। আপনি যদি সূক্ষ্ম বিচার করেন, তা হলে দেখবেন এই গণতন্ত্রের শ্রেণিচরিত্র হচ্ছে পুঁজিবাদী শ্রেণিচরিত্র। তা হোক, কোটি কোটি মানুষ তো এটাই চায়। এখানে আপনার একটু খটকা লাগতে পারে, মনে পড়তে পারে গালিলিও গালিলেইয়ের ঘটনাটা। হাজার হাজার মানুষ ছিল একদিকে, গালিলেই ছিলেন আরেক দিকে- একা।
গালিলেইয়ের কথা থাক। আপনি গণতন্ত্র নিয়েই ভাবুন। আজকের মানবসমাজে গণতন্ত্র ভীষণই আকাক্সক্ষার বস্তু। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ও রাষ্ট্রের জন্য এটাই উপযুক্ত বলে জ্ঞান করে পৃথিবীবাসী মানুষ। গণতন্ত্রের জন্য এই মানুষদের আকণ্ঠ তৃষ্ণা আছে। এ নিয়ে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম রচিত হয়েছে তাদের জীবনে; অনেকে নিজের অতীব মূল্যবান জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছে, আগামীতেও দেবে তার লক্ষণ স্পষ্ট। যখন ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র পাষাণের ভার হয়ে চেপে বসে জনগণের ওপর, জনগণ দম আটকে মরার দশায় পৌঁছায়, তখন ছটফট করে ওঠে আর শুরু হয় বাঁচার লড়াই- গণতান্ত্রিকতার জন্য মরিয়া জনগণ তখন বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে দিতে পিছপা হয় না। প্রশ্ন হচ্ছে, ফ্যাসিবাদ কী?
আপনি নিশ্চয় শুনে থাকবেন একটি শব্দ, নিও নাৎসি। ইউরোপে এই নিও নাৎসিদের উত্থান ঘটেছে কিছু কাল আগে। নিও নাৎসি মানে নব্য নাৎসি। ঠিক তেমনি নিও ফ্যাসিজম, অর্থাৎ নব্য ফ্যাসিবাদ। নাৎসি বা ফ্যাসিস্ট সম্পর্কে আপনার নিশ্চয় জানা আছে। নিও যেহেতু নব্য, তার মানে হলো এগুলোর পুরোনো বা আদি সত্তা ছিল। হয়তো এখনও আছে।
সেই আদি সত্তাকে বলতে পারেন ক্লাসিক বা ধ্রুপদী সত্তা। এভাবেই এটাকে শনাক্ত করেছেন আর্জেন্টিনার লেখক ও চিন্তাবিদ এর্নেস্তো সাগাতো। তিনি বলেছেন- ধ্রুপদী ফ্যাসিজম উর্দি পরে এসেছিল বলে তাকে চেনা গিয়েছিল। আজকের নিও ফ্যাসিজম আসে স্যুট-টাই পরে। ফলে মানুষ তাকে উন্নয়ন ভেবে ভুল করে।
ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে ভাবলেই আপনার মনের পর্দায় ফুটে উঠবে হিটলারের উর্দি, মুসোলিনির সামরিক কুচকাওয়াজ, গেস্টাপো, ব্ল্যাকশার্ট, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, সেন্সরশিপ, সহিংসতা ও যুদ্ধের উন্মাদনা। এই ফ্যাসিবাদ আক্রমণ করেছিল রাষ্ট্রকাঠামোকে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে। তার সবটাই ছিল স্বৈরতান্ত্রিক।
সাবেকি আমলে এই ধরনের ফ্যাসিবাদকে সহজেই চেনা যেত। কিন্তু এখনকার ফ্যাসিবাদ গিরগিটির মতো রং বদলায়, ক্যামোফ্লেজ করে মিশে থাকে এমনভাবে যে আপনি শনাক্ত করতে হিমশিম খাবেন। রং বদলের পালায় সে ব্যবহার করে উন্নয়ন, জাতীয়তাবাদ, সুশাসন, ধর্ম, ইতিহাস ইত্যাদি মন্ত্র।
সে এখন সাংবাদমাধ্যমকে কিনে নেয়; জার্মান রাইখস্টাগের মতো সংসদকে পোড়ায় না, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কিনে নেয়; ইতিহাসের পাঠ বদলে দেয়; বিরোধীদের দেশদ্রোহী ঘোষণা করে; আর গণতন্ত্রের আত্মাকে করপোরেট রেজিস্টারে হত্যা করে; চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতীয়তাবাদ আর ধর্মের উগ্রতায় আবেগান্ধ করে রাখে জনগোষ্ঠীকে।
এই বিভ্রমের বিরুদ্ধে লড়াই করা সহজ নয়। যেকোনো জাতির জন্য এটা ভয়ংকর বিপদ আর এই বিপদের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন এর্নেস্তো সাবাতো। অনেক কাল আগে জর্জ অরওয়েল লিখেছিলেন, সত্য থেকে একটা সমাজ যতবেশি দূরে সরে যায়, ততই সেই সমাজ ওই ব্যক্তিকে বেশি ঘৃণা করে যে এ সম্পর্কে কথা বলে।
আপনি এবার আপনার চারপাশের পৃথিবীটার দিকে তাকান। দেশে দেশে যা কিছু ঘটছে, দেখুন একবার। গণতন্ত্র আজ কী অবস্থায় আছে, কী ভয়ানক বেহাল আর শোচনীয় দশায় পড়েছে, দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়। সুদূর আমেরিকা বা ইউরোপে যাওয়ার দরকার কী, আশপাশে ডানে-বাঁয়ে তাকালেই তো দেখা যায়। ধর্মীয় হিংসা, জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা আজ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কবরে সেঁধিয়ে দিয়েছে প্রায়। মানবজাতির সুস্থ চিন্তনের কোনো জায়গাই যেন আজ আর অবশিষ্ট থাকছে না। গণতন্ত্রের জন্য আমাদের সময় যেন এক বীভৎস কালবেলা।
/এসএকে