উৎসব মানেই গরু, খাসি কিংবা বিভিন্ন প্রাণীর মাংসের বাহারি পদ। ধোঁয়া ওঠা খাসির মাংস বা গরুর চাপ- বাঙালির খাদ্যতালিকায় এর স্থান সবসময়ই সবার ওপরে। তবে অনেকেই অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার পর শরীরে ব্যথা, পায়ের আঙুল ফুলে যাওয়া, তীব্র যন্ত্রণা, মাটিতে পা ফেলাই যাচ্ছে না বা জয়েন্টে অস্বস্তি বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, এসব সমস্যার পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। আর এর পেছনে প্রধান শত্রু হিসেবে কাজ করছে অতিরিক্ত প্রাণীর মাংস খাওয়ার অভ্যাস।
ইউরিক অ্যাসিড কী এবং কেন বাড়ে?ইউরিক অ্যাসিড মূলত আমাদের শরীরের একটি স্বাভাবিক বর্জ্য পদার্থ। আমরা যা খাই, বিশেষ করে যেসব খাবারে ‘পিউরিন’ নামক প্রোটিন বেশি থাকে, শরীর তা ভেঙে ইউরিক অ্যাসিড তৈরি করে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই অ্যাসিড রক্তে দ্রবীভূত হয়ে কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু গোলমাল বাঁধে তখন, যখন রক্তে এর মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং কিডনি তা পুরোপুরি শরীর থেকে বের করতে পারে না। এই অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড ক্রিস্টাল বা ধারালো সুঁইয়ের মতো দানায় পরিণত হয়ে আমাদের হাড়ের জয়েন্টে, বিশেষ করে পায়ের আঙুল, গোড়ালি বা হাঁটুতে জমা হতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থাকে বলা হয় গেঁটে বাত।
রেড মিট : ইউরিক অ্যাসিডের প্রধান উপাদানসব মাংসে পিউরিনের মাত্রা এক নয়। তবে গরু, খাসি, ভেড়া বা মহিষের মাংস, যেগুলোকে আমরা ‘রেড মিট’ বলি, সেগুলোতে পিউরিনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে। এ ছাড়া প্রাণীর কলিজা, মগজ, ফুসফুস (অর্গান মিট) ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা রকেটের গতিতে বাড়িয়ে দিতে পারে। যারা নিয়মিত এবং অতিরিক্ত পরিমাণে এসব মাংস খান, তাদের রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এমনকি অতিরিক্ত মুরগির মাংস বা সামুদ্রিক মাছও কখনো কখনো এই সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
আরও পড়ুন
ডা. আখতার উজ জামান সজীব বলেন, শুধু মাংস খেলেই যে সবার ইউরিক অ্যাসিড বাড়বে, বিষয়টি এমন নয়। কারও শরীরে বংশগত কারণে এ প্রবণতা বেশি থাকতে পারে। আবার যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা বা স্থূলতা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
লক্ষণ : ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে গেলে শরীরে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
যেমন-পায়ের বুড়ো আঙুল, গোড়ালি, হাঁটু বা হাতের কবজি হঠাৎ ফুলে যাওয়া এবং লাল হয়ে যাওয়া।
আক্রান্ত জয়েন্টে তীব্র ও অসহ্য ব্যথা হওয়া, যা ছোঁয়া মাত্রই যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে।
আক্রান্ত স্থানটি গরম হয়ে যাওয়া এবং জয়েন্ট নাড়াচাড়া করতে তীব্র কষ্ট হওয়া।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করালে কিডনিতে পাথর জমা হওয়া।
ডা. আখতার উজ জামান সজীব আরও বলেন, যাদের আগে থেকেই ইউরিক অ্যাসিড বেশি, তারা খাদ্যতালিকায় নিয়ন্ত্রণ আনবেন। প্রতিদিন অতিরিক্ত লাল মাংস না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো। পাশাপাশি বেশি পানি পান করা জরুরি, কারণ পানি শরীর থেকে ইউরিক অ্যাসিড বের হতে সহায়তা করে।
স্বাদ ও স্বাস্থ্যের ভারসাম্যইউরিক অ্যাসিড বেড়েছে শুনলেই অনেকে প্যানিকড হয়ে মাংস খাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দেন। সম্পূর্ণ বন্ধ করার চেয়ে সচেতনতা এবং পরিমিতিবোধই এখানে আসল চাবিকাঠি।
মাংসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ : যদি ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা থেকে থাকে, তবে রেড মিট এবং কলিজা খাওয়া থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকুন। যদি খেতেই হয়, তবে মাসে এক-আধবার চর্বিহীন মাংসের দুয়েকটি ছোট টুকরো খেতে পারেন।
প্রচুর পানি পান : ইউরিক অ্যাসিডের রোগীদের জন্য পানি হলো মহৌষধ। প্রতিদিন অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার পানি পান করুন। পানি রক্তে থাকা অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিডকে পাতলা করে।
খাদ্যতালিকায় বদলমাংসের বদলে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে কম ফ্যাটযুক্ত দুধ, টকদই এবং ডিমের সাদা অংশ খেতে পারেন। ভিটামিন ‘সি’ যুক্ত ফল (লেবু, আমলকী, কমলা) ইউরিক অ্যাসিড কমাতে দারুণ কার্যকরী। এ ছাড়া শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার ও কম চর্বিযুক্ত খাবার বাড়ানো উচিত। সফট ড্রিংকস, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারও ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অনেকেই মনে করেন, ইউরিক অ্যাসিড মানেই মাংস পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। এটি ভুল ধারণা।