মক্কার আকাশে ফজরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। আর সেই আলোয় সাদা ইহরামের ঢেউয়ে ঢেকে যাচ্ছে আরাফাতের বিস্তীর্ণ প্রান্তর। চারদিক থেকে ভেসে আসছে এক হৃদয়স্পর্শী ধ্বনি, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’। মনে হয়, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা আজ এসে মিলেছে এক জায়গায়, মহান আল্লাহর দরবারে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এই মহাসমুদ্রে। অশ্রুসিক্ত চোখে, কাঁপা কণ্ঠে, গভীর অনুতাপে লাখো হাজি আজ দাঁড়িয়ে আছেন ক্ষমা, রহমত ও নতুন জীবনের আশায়।
পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা পালনে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মুসল্লি। সোমবার (২৫ মে) মিনায় ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানোর পর গত রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত দলে দলে হাজিরা পৌঁছান আরাফায়। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, আরাফাতে অবস্থানই হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোকন।
আজ আরাফার প্রতিটি প্রান্ত যেন এক অপার্থিব আবেগে মোড়ানো। সাদা ইহরামে আচ্ছাদিত মানুষের ঢল, অঝোর কান্না আর একসঙ্গে উচ্চারিত ‘লাব্বাইক’ ধ্বনি সৃষ্টি করেছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ। কেউ নিজের গুনাহ মাফের জন্য হাত তুলেছেন, কেউ পরিবার-পরিজনের শান্তি কামনা করছেন, আবার কেউ যুদ্ধ-বিধ্বস্ত পৃথিবীতে মানবতার মুক্তির জন্য প্রার্থনা করছেন।
পবিত্র হজের খুতবা প্রদান করেন শায়খ আলী ইবনে আব্দুর রহমান আল হুজাইফি। একই সঙ্গে তিনি মসজিদে নামিরায় নামাজের ইমামতিও করবেন। হারামাইন শরিফাইনের তত্ত্বাবধানে বাংলাসহ ৩৪টি ভাষায় সরাসরি সম্প্রচার করা হবে হজের খুতবা। বাংলা অনুবাদের দায়িত্ব পালন করছেন ড. খলিলুর রহমান, আ ফ ম ওয়াহিদুর রহমান, মুবিনুর রহমান ও নাজমুস সাকিব। মানারাতুল হারামাইন অ্যাপ, আল কোরআন চ্যানেল, আস সুন্নাহ চ্যানেলসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলায় শোনা যাবে এই খুতবা।
ইতিহাসের দিক থেকেও আরাফা মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় পনেরশ বছর আগে এই ময়দানেই মহানবী মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। মানবাধিকার, সাম্য, ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্বের সেই চিরন্তন বার্তা আজও বিশ্ব মুসলিমের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
সূর্যাস্তের পর হাজিরা রওনা হবেন মুজদালিফার পথে। সেখানে রাতযাপন ও শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য পাথর সংগ্রহ করবেন তারা। এরপর ১০ জিলহজ মিনায় ফিরে বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ, কুরবানি এবং মাথা মুণ্ডনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন। পরে কাবা শরিফ তওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সায়ি আদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হবে হজের গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলো। সবশেষে বিদায়ী তওয়াফের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা।
বাংলাদেশ হজ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ২০১টি ফ্লাইটে হজ ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যসহ মোট ৭৯ হাজার ১৬৪ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ২৮ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।
এদিকে গতকাল ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ মিনায় তাবুতে গিয়ে হাজিদের খোঁজখবর নিয়েছেন। প্রচণ্ড তাপের কারণে তাঁবু থেকে কম বের হওয়া ও তপ্ত রোদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/জেডআই