বিশ্ব মুসলিমের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। জিলহজ মাসের দশ তারিখে বিশ্বের মুসলিমরা স্মরণ করেন হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগ, যিনি আল্লাহর আদেশ পালনে প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে উৎসর্গ করতে পিছপা হননি। এই আত্মসমর্পণ, এই ঈমানি দৃঢ়তা কেবল একটি ঘটনার কথা বলে না, এটি রূপ দেয় একটি জাতির আত্মার ভিতকে। বিশ্বের নানা প্রান্তে ঈদুল আজহার উদযাপন পায় বিচিত্র রূপ, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে যুক্ত হয় স্থানীয় পরিমণ্ডল। তবে এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটি গভীর ঐক্য বিরাজ করে। ত্যাগের যে মহৎ শিক্ষা, তা সবার জন্য এক ও অভিন্ন। এটি কেবল পশু কুরবানির মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অন্তরের অহংকার, স্বার্থপরতা ও সংকীর্ণতাকে বিসর্জনের অনুপ্রেরণাও বয়ে আনে। ঈদুল আজহা আমাদের শেখায় সংহতি, সাম্য এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেতনা।
সৌদি আরব
মক্কা-মদিনা থেকে শুরু হয় এই উৎসবের পবিত্র সূচনা। হজের অন্তিম দিনে কুরবানি দেওয়ার পর গোশত বিতরণ করা হয় দেশি-বিদেশি দরিদ্রদের মধ্যে। রান্নায় ‘মান্ডি’, ‘কাবসা’ জাফরান, কিশমিশ ও গরুর মাংসের রঙিন রেসিপি। মরুর হাওয়ায় প্রথা আর প্রাচুর্য হাত ধরাধরি করে জেগে ওঠে ঈদের দিন।
ইরাক
বাগদাদের আকাশে ভোরের তাকবির ধ্বনিত হয় এক শিহরণ জাগানো আনন্দের আহ্বান। উঠানে অপেক্ষা করে গরু, ভেড়া ও উট ত্যাগের প্রতীক্ষায়। কুরবানির পর রান্না হয় কুবা, ডোলমা এবং সুগন্ধি মাংস-ভাতের নানা পদ। একপাশে ধোঁয়া ওঠা হাঁড়ির পাশে জড়ো হয় গল্পের আসর, আরেক পাশে দরিদ্রদের বাড়িতে পৌঁছে যায় সদ্য কাটা মাংসের উষ্ণতা। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও আতিথেয়তার দীপ্ত আলোয় ঈদ পালন করে ইরাক।
ইরান
পর্বতঘেরা পারস্য ভূমিতে ঈদের সকাল শুরু হয় নামাজের মাধ্যমে। শিয়া ঐতিহ্য মেনে কুরবানি হয় ভেড়া ও গরু। তারপর রান্নাঘরে তৈরি হয় চেলো কাবাব, জাফরানি পোলাও এবং মসলায় ভরা কোরমা জাতীয় পদ। কুরবানির মাংস আত্মীয় ও দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়াকে এখানে বিবেচনা করা হয় একটি ধর্মীয় দায়িত্ব ও সামাজিক সৌন্দর্য হিসেবে। পরিবার, বিশ্বাস আর উদারতার সংমিশ্রণে ইরানে কুরবানির ঈদ হয়ে ওঠে এক জীবন্ত উৎসব।
সিরিয়া
সিরিয়ায় কুরবানির দিনের শুরু হয় এক আবেগঘন আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের কর্তা হাতে নেন কুরবানির দায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ হলেও এই দিনটি সেখানে বয়ে আনে এক ভিন্ন আবহ, যেন রক্তাক্ত আকাশে জেগে ওঠে শান্তির সূর্য। পরিবারে পরিবারে রান্না হয় ‘কুফতা’ আর ‘তমান’, মসলার ঘ্রাণে মুখরিত হয়ে ওঠে আশার ঝিম ধরা আঙিনাগুলো। কুরবানির এই দিন তাদের কাছে কেবল উৎসব নয়, বরং তা হয়ে ওঠে সম্মিলিত প্রার্থনার মতো। যেখানে এক টুকরো গোশতেও মিশে থাকে ঐক্যের ছায়া।
আফ্রিকা
নাইজার, মালি, চাদ, সেনেগাল প্রভৃতি অঞ্চলে দেখা যায় ইসলামি ঐতিহ্যের ভিন্ন রূপ। সেখানকার ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা সকালবেলা ময়দানে নামাজ পড়েন। তারপর গ্রামে গ্রামে চলে পশু জবাই। রান্নায় থাকে ‘জলফ রাইস’, ‘ইয়াসা’ গোশত ও লেবুর রস মেশানো মিষ্টি ঝাঁঝালো খাবার। সোমালিয়াতে ‘সুক্কার’ (ঝাঁঝালো মাংস ভাজি) আর ‘লাহোহ’ রুটি জনপ্রিয়। গাম্বিয়া, গিনি ও মৌরিতানিয়ায় শিশুদের নতুন পোশাক, ঈদ উপহার আর পারিবারিক আড্ডার প্রচলন রয়েছে। লিবিয়া, আলজেরিয়া, সুদান, সবখানে কুরবানি, রান্নায় মসলাদার ঝোল, চায়ের আয়োজনে দীর্ঘ আড্ডা চলে।
দক্ষিণ এশিয়া
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশ। দেশের মানুষ নামাজ শেষে পশু জবাইয়ে ব্যস্ত সময় কাটান। পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে চলে মাংস কাটা। তারপর রান্না হয় ভুনা মাংস, পোলাও আর সাদা কোরমা। গ্রামে হয় মেলা, শহরে শিশুদের হাসি-খুশিতে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। পাকিস্তানে তৈরি হয় ‘নেহারি’, ‘চাপলি কাবাব’, ‘শাহি কোরমা’। কুরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করে দরিদ্রদের বণ্টন করা হয়।
আফগানিস্তানে ‘কাবুলি পোলাও’, মিষ্টি চালের সঙ্গে কিশমিশ ও বাদামের সাজে ঈদের দাওয়াত। মালদ্বীপে দ্বীপজীবনের সরলতায় ঈদ হয় সাগরের ঢেউয়ের মতো কোমল। কুরবানির পর টুনা ও গরুর মাংসের মিলিত রান্না, মসলা ও নারকেল দুধে স্নিগ্ধ স্বাদ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। ঈদের আগের রাতে প্যাকেটজাত গোশত দরিদ্রদের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। রান্নায় ‘রেনডাং’ মাংস ও নারকেল দুধের ধৈর্যের রান্না। মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইতে জনপ্রিয় ‘সাতায়’, ‘লেমাং’ (বাঁশে ভাত), ‘দোডল’ নামক মিষ্টান্ন। ঈদের জামাতে সবাই অংশ নেয়, পরে বাড়িতে কুরবানি।
মধ্য এশিয়া
উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান প্রভৃতি দেশে কুরবানির ঈদের নাম ‘কুরবান আইত’। সকালে নামাজ, তারপর কুরবানি। রান্নায় ‘প্লোভ’ চাল, গাজর, মাংসের মনোমুগ্ধকর সংমিশ্রণ। তুরস্কে ‘কুরবান বাইরাম’ নামে পরিচিত। পরিবারের ছোটরা বড়দের সালাম করে মিষ্টি নেয়। ‘কাভুরমা’ রান্না হয়। ভাজা মাংস যা সংরক্ষণযোগ্য। আজারবাইজানে কুরবানি এক উৎসব, হালাল বাজারে কেনাবেচা জমজমাট। মসজিদভিত্তিক গোশত বিতরণ অত্যন্ত শৃঙ্খলিত।
ইউরোপ
আলবেনিয়া, বসনিয়া, কসোভো প্রভৃতি দেশে ঈদের জামাত হয় ঐতিহাসিক মসজিদে। পরিবারে চলে প্রার্থনা, রান্না হয় ‘পিতা’, ‘বাকলাভা’, আর কুরবানির গোশত ভাগ হয় আত্মীয়দের মাঝে। জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বড় শহরগুলোতে প্রবাসী মুসলমানরা কুরবানি দেন ইসলামিক সেন্টারের মাধ্যমে। রান্না হয় মাতৃভূমির স্মৃতিজড়িত পদ।
চীন ও রাশিয়া
চীনের উইঘুর মুসলমানরা কুরবানি করেন সাংস্কৃতিক নিপীড়নের মধ্যেও। রান্নায় থাকে ‘ল্যাগমান’, ‘সামসা’। চেচনিয়া ও দাগেস্তানে ‘খিনকাল’ নামক মাংস-রুটি-পেঁয়াজভিত্তিক রেসিপি ঈদের সৌন্দর্য বাড়ায়। শিশুরা কবিতা আবৃত্তি করে ঈদের শুভেচ্ছা জানায়।
ফিলিস্তিন
গাজার ধ্বংসস্তূপে যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন একটুখানি হাসির জন্যও রক্ত দিতে হয়। পশ্চিম তীরে ঈদ আসে বুকভরা শোক আর প্রতিরোধের দীপ্তি নিয়ে। কুরবানির মাংসে রান্না হওয়ার কথা ছিল ‘মাকলুবা’ স্তরে স্তরে সাজানো ভাত, পেঁয়াজ ও সুগন্ধি মসলায় সেদ্ধ মাংস।
পরিবারের সবাই একত্র হয়ে খাওয়ার কথা ছিল, শহিদদের কবর জিয়ারত করে দোয়া করার কথা ছিল। কিন্তু এ বছর চুলায় আগুন নেই, পাতিলে পানিও নেই। অধিকৃত ভূমিতে ঈদের খাবারের বদলে নেমে আসে রক্ত ও ধ্বংসের ছায়া। শিশুরা চাঁদ দেখতে গিয়ে ড্রোনের গর্জনে ভয়ে কেঁপে ওঠে, মায়েরা কুরবানির পশু নয়, নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে কান্না করে ফেরেন। কুরবানি কেবল একটি ধর্মীয় প্রথা নয়; এটি মানবিকতা, আত্মত্যাগ ও সংহতির প্রতীক। বিশ্বের নানা প্রান্তে এই দিবসটি আলাদা পদ্ধতিতে উদযাপিত হলেও মূল চেতনা একই। এক দিনের ত্যাগ, পুরো বছরের স্মরণ। ভিন্ন ভাষা, আলাদা খাবার, বিচিত্র সংস্কৃতিÑ তবু একটি হৃদয় একসঙ্গে স্পন্দিত হয় এই দিনে।
সময়ের আলো/জেডআই