হরিজনপল্লীতেও এবার ঈদের আনন্দ

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

রুমা বাসফোরের বয়স পঞ্চাশ। প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই হাতে ঝাড়ু তুলে নেন তিনি। গাইবান্ধা শহরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার করেন, অথচ

2026-05-27T20:42:51+00:00
2026-05-27T20:42:51+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
হরিজনপল্লীতেও এবার ঈদের আনন্দ
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ৮:৪২ পিএম 
ছবি : সময়ের আলো
রুমা বাসফোরের বয়স পঞ্চাশ। প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই হাতে ঝাড়ু তুলে নেন তিনি। গাইবান্ধা শহরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার করেন, অথচ শহরের কোনো হোটেলে তাকে বসতে দেওয়া হয় না। চায়ের দোকানে তার জন্য আলাদা কাপ। বছরের পর বছর ধরে এই বৈষম্যই তার নিত্যসঙ্গী।

কিন্তু এবার ঈদের আগে একটু অন্যরকম অনুভূতি হলো রুমার। গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক নিজে তার পাশে বসলেন, নিজের হাতে তুলে দিলেন ঈদ উপহার। চোখের কোণ ভিজে গেল রুমার। বললেন, ‌‌আমাদেরকে হোটেলে বসতে দেয়না, চায়ের কাপে চা দেয়না। আমরা পরিচ্ছন্নতাকর্মী, তাই আমাদের কেউ মানুষ মনে করেনা। আজ ডিসি সাব আমাদের কাছে বসলেন, নিজের হাতে টাকা ও ঈদের উপহার তুলে দিলেন। এবার আমরাও ঈদ করবো। ভগবান ডিসি সাবের ভালো করুক।

কিছুদিন আগে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয় গাইবান্ধার হরিজন সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রামের চিত্র। দিনের পর দিন সমাজের আড়ালে থেকে শহর পরিষ্কার রাখা এই মানুষগুলোর বঞ্চনার গল্প পর্দায় দেখে নাড়া খান এক স্থানীয় ব্যবসায়ী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই ব্যবসায়ী সিদ্ধান্ত নেন, এই ঈদে হরিজন পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হাতে তুলে দেবেন এক হাজার টাকা করে নগদ অর্থ।

একই উদ্যোগে এগিয়ে আসেন গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা। ঈদের আনন্দ যেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দোরগোড়াতেও পৌঁছায়, সেই লক্ষ্যে তিনি হরিজন পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেট তৈরি করেন। প্রতিটি প্যাকেটে ছিল চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনিসহ আট ধরনের নিত্যপণ্য।

বুধবার বিকেলে শহরের স্বাধীনতা প্রাঙ্গণে এক আবেগময় আয়োজনে মিলিত হন সবাই। গাইবান্ধা পৌর এলাকার হরিজন সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবারের সদস্যরা একে একে এগিয়ে আসেন। জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা নিজ হাতে প্রতিটি পরিবারের হাতে তুলে দেন ঈদ উপহারের প্যাকেট। পাশাপাশি বেনামী ব্যবসায়ীর পাঠানো নগদ অর্থও বিতরণ করা হয় পরিবারপ্রতি।

রুমা বাসফোরের মতো মৌ বাসফোর (৩৫), শালু বাসফোর (৪০), বিলু বাসফোর (৫২) সহ অন্যরাও উপহার হাতে পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েন। অনেকের চোখে জল, ঠোঁটে হাসি-এই দৃশ্য উপস্থিত সকলকে স্পর্শ করে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতার, চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক যাদব সরকার, এনডিসি সাব্বির রহমান, গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সভাপতি অমিতাভ দাশ হিমুন, সহসভাপতি রেজাউন্নবী রাজু, অবলম্বনের নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী এবং স্থানীয় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।

জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, যারা বাড়িঘর, অফিস-আদালত, রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন রাখেন, তারাও এই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সবার সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেই এমন আয়োজন।

অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতার বলেন, এমন আয়োজন সত্যিই ব্যতিক্রম। আমরা এই মানুষগুলোকে সব সময় দূরে রাখতে চাই। কিন্তু কাউকে পিছিয়ে রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায় না। যে ব্যবসায়ী নাম না জানিয়ে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন, তিনি সত্যিই উদারমনের মানুষ। আর জেলা প্রশাসনও প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে।

হরিজন সম্প্রদায় যুগের পর যুগ ধরে সমাজের অন্ধকার কোণে বসবাস করে আসছে। শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করলেও তাদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। গণপরিবহনে জায়গা নেই, রেস্তোরাঁয় প্রবেশ নেই, সন্তানেরা বিদ্যালয়ে বৈষম্যের শিকার-এই বাস্তবতা এখনো অনেকটাই অপরিবর্তিত।

তবে গাইবান্ধার এই ছোট্ট আয়োজন একটি বার্তা দিয়ে গেছে, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি যদি এগিয়ে আসেন, সমাজের সচেতন মানুষ যদি সাড়া দেন, তাহলে বদলাতে পারে অনেক কিছু।

এক হাজার টাকা হয়তো বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু রুমা বাসফোরের চোখে যে আলো জ্বলে উঠেছে, সেটার দাম অনেক বেশি।

আরবিএন 



Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: