এখানে আজ ঈদ। কিন্তু আমাদের ঈদ নেই। নেই মানে, হাজিদের জন্য ঈদ হয় না। ঈদের নামাজও নেই। হাজিরা এদিন বড় শয়তানকে পাথর মারে। দীর্ঘ পথ হাঁটে। কুরবানি দেয়। মাথা মুণ্ডন করে, ইহরাম খোলে।
কাল রাতে আরাফা থেকে এসেছিলাম, পথে হাঁটা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। লাখো মানুষের সঙ্গে তীব্র গরমে হাঁটতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকেই। শুধু কি তাই? পাথর মারা শেষে আবারও ৪-৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে গন্তব্যে ফিরতে হয়।
আমার অবস্থাও খারাপ। কোমর থেকে পা যেন ফুলে কলাগাছ। পায়ের পাতায় ফোসকা পড়ে গেছে। কিন্তু থামার সুযোগ কই? পথে পথে সৌদি সরকারের স্থাপন করা কল থেকে ঠান্ডা পানি খাই আর হাঁটি। মুখে তখন তালবিয়া— লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...।
দুঘণ্টার মতো সময় লেগেছে জামারায় পৌঁছাতে। শরীর যেন আর চলছে না। মুজদালিফা থেকে কুড়িয়ে নেওয়া সাতটি পাথর মেরেছি বড় শয়তানের প্রতীকে। এরপর আবার হাঁটা...।
জামারা থেকে বেশিরভাগ হাজিই মিনার তাঁবুতে ফিরে যায়। গুগল ম্যাপ জানাল, ৩.৭ কিলোমিটার পথ। আমরা হোটেলের পথ বেছে নিয়েছি। ৪ কিলোর চেয়ে একটু বেশি৷ ক্ষুধা পেট, ক্লান্ত শরীর আর তপ্ত হয়ে ওঠা রোদ! আর পসিবল না হাঁটা। রাস্তার দুধারে হাজার হাজার মানুষকে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে। আমরাও জিরিয়ে নিলাম কিছুটা।
ট্যাক্সি দেখে মনটা খুশি হয়ে গেল। কিন্তু না, দাম শুনে মাথায় হাত! এটা কী করে সম্ভব? এরা কি মানুষ?
আমি জাস্ট থ। ৪ কিলোর চেয়ে একটু বেশি পথ। ২০-৩০ রিয়াল ভাড়া। অথচ চাইছে কত, আন্দাজ করেন তো! আমি? শিউর, আপনার ধারণা এখানে আটকে যাবে।
৩০ রিয়ালে বাংলাদেশি টাকায় ৯৯০ টাকা। আচ্ছা, হজের মৌসুম, ঈদের দিন। একটু বেশি তো নিতেই পারে। এমন প্রস্তুতি অবশ্য আমার আছেই। বাংলাদেশ থেকেও শুনে গিয়েছিলাম, এদিন ভাড়া অনেক বেশি নেয়। অনেক বেশি আর কত? ১০০ রিয়াল, ২০০ রিয়াল?
না।
সব ধারণা ভুল।
১০০০ রিয়াল ভাড়া চেয়েছে এখানকার ট্যাক্সিঅলারা!
মানে বাংলাদেশি টাকায় মাত্র ৩৩ হাজার টাকা! চিন্তা করা যায়? একজন না, সবাইই এই ভাড়া চায়।
২০ মিনিটের রাস্তা, ২০ রিয়ালের ভাড়া আর আমাদের কাছে চেয়েছে ১০০০ রিয়াল। ভাড়া শুনে সব ক্লান্তি টান্তি ভুলে গেলাম। এক নিমিষে সিদ্ধান্ত নিলাম, থামব, রেস্ট নেব, আবার হাঁটব।
গুগল ম্যাপ খুলে হাঁটা ধরলাম। পথে পথে মন মুগ্ধ-করা অনেক ঘটনা। হুইল চেয়ারে বসে থাকা মাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে সন্তান। কই, এখানে তো ক্লান্তি নেই। এখানে শুধু শান্তি আর শান্তি।
যেখানে ১০০০ রিয়ালের মতো আকাশ কুসুম, অবাস্তব ভাড়া চাওয়ার কারণে আমাদের হাঁটতে হচ্ছে, সেখানেই আবার দেখা যাচ্ছে কেউ কেউ পথে পথে পানি, আইসক্রিম আর খাবার বিতরণ করছে। কেউ কেউ হাজিদের জন্য ছাতাও বিলিয়ে যাচ্ছে।
হাসিমুখ, ওয়েলকামিং।
'তাকাব্বালাল্লাহু মিনকুম' বলে দোয়াও করছে। আমি ঠিক মেলাতে পারি না, এরাই কি এত ভাড়া চাইতে পারে? এদের এমন গলাকাটা ভাড়া না দিতে পেরে কতো হাজার হাজার অক্ষম মানুষকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে হেঁটে গন্তব্যে ফিরতে হয়েছে। হজ করতে এসে মন খারাপ করে রাস্তার পাশে বসে থাকতে হয়েছে। আল্লাহ মালুম।
অবশ্য পরে জেনেছি, একজন ট্যাক্সি চালকও সৌদিয়ান না। ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মিশর আর বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা সব ড্রাইভার। এদের কাছে, হজ, ঈদ আর মানবিকতার বালাই নেই।
এতক্ষণে আমার পায়ে ফোসকা জ্বালাতন শুরু করেছে৷ আর কুলাচ্ছে না। ২ কিলো পথ হাঁটা হয়ে গেছে। আবার ট্যাক্সি দেখতে লাগলাম। ৩০০-তে নেমে এসেছে। দরদাম করে একজনকে ১০০ রিয়ালেে রাজি করিয়ে চেপে বসলাম৷ ২ কিলোমিটার পথ, ৫ মিনিট সময় বাংলাদেশি টাকায় ৩৩০০ টাকা। তবুও মুক্তি!
এতো কথা বলতে গিয়ে ভুলে গেছি—আজ ঈদের দিন। হোটেলের আশেপাশে, চারপাশে কেউ নেই। ২-৪ টা দোকান রেস্টুরেন্ট খোলা আছে। খেতে হবে৷ খুঁজে নিয়ে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট থেকে ঈদের খাবার পোলাও-বিফ খেলাম। পেটভরে। আরাম করে।
কোনোমতে রুমে এলাম। এরপর আর কিছু মনে নেই। ঘুম, শান্তির ঘুম।
ঈদ মোবারক!