মাথার ওপর মুষলধারে বৃষ্টি, আর পায়ের নিচে ভিজা মাঠ— সবকিছু উপেক্ষা করেই কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে সম্পন্ন হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাত। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল ৯টায় শুরু হওয়া এই জামাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি খোলা মাঠে ভিজে ভিজেই ঈদের নামাজ আদায় করেন এবং ত্যাগের মহিমায় শরিক হন।
১৮২৮ সালে যাত্রা শুরু করা শোলাকিয়ার ঐতিহাসিক এই ঈদ জামাতের ধারাবাহিকতায় এবার অনুষ্ঠিত হলো ঈদুল আজহার ১৯৯তম জামাত। এই ঐতিহ্যবাহী জামাতে ইমামতি করেন কিশোরগঞ্জ শহরের বড় বাজার মসজিদের সম্মানিত খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ।
মাঠের শতবর্ষের ঐতিহ্য ও রীতি অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছুড়ে মুসল্লিদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও চূড়ান্ত সংকেত দেওয়া হয়। আজ নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিট আগে তিনটি, ৫ মিনিট আগে দুটি এবং ঠিক ১ মিনিট আগে একটি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। এরপর শুরু হয় নামাজ। জামাত ও খুতবা শেষে এক আবেগঘন পরিবেশে দেশ, জাতি এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
কোরবানির ঈদের ব্যস্ততা এবং বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও দূর-দূরান্তের মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে প্রতিবারের মতো এবারও বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ‘শোলাকিয়া স্পেশাল’ নামের দুটি বিশেষ ট্রেনের একটি ময়মনসিংহ থেকে এবং অন্যটি ভৈরব থেকে মুসল্লিদের নিয়ে সকালে কিশোরগঞ্জে পৌঁছায় এবং জামাত শেষে আবার নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যায়।
শোলাকিয়া ঈদগাহ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুল হাসান মারুফ জানান, বৈরী আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টির কারণে এবারের জামাতে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ হাজার মুসল্লি অংশ নিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহার জামাতে সাধারণত মুসল্লির উপস্থিতি কিছুটা কম হয়ে থাকে, কারণ ঈদের দিন সকালেই অনেকেই কোরবানির পশুর হাসিল ও জবাইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
আজকের এই ঐতিহাসিক জামাতে সাধারণ মুসল্লিদের পাশাপাশি অংশ নেন কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ খান সোহেলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ।
শোলাকিয়ার নামকরণের ইতিহাস
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হয়বত খান বাহাদুর ১৮২৮ সালে কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে প্রায় সাত একর জমির ওপর এই শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ প্রতিষ্ঠা করেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, ওই বছরের প্রথম জামাতে প্রায় ‘সোয়া লাখ’ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই থেকে মাঠটির নাম হয় ‘সোয়া লাখি মাঠ’। পরবর্তীতে কালের বিবর্তনে এবং আঞ্চলিক উচ্চারণের কারণে এটি আজকের ‘শোলাকিয়া’ নামে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। প্রায় সাত একর আয়তনের এই ঐতিহাসিক মাঠে ২৬৫টি কাতার রয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে একসঙ্গে দুই লাখেরও বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
/কহু