ঈদুল আজহার দিন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের দেওয়ান পাড়ায় দেখা যায় এক ব্যতিক্রমী চিত্র। গ্রামের যেসব পরিবার কোরবানি দেন, তারা নিজেদের পশুর মাংসের একটি অংশ নির্ধারিত স্থানে জমা করেন। পরে সেই মাংস সমানভাবে ভাগ করে পৌঁছে দেওয়া হয় কোরবানি দিতে না পারা পরিবারগুলোর ঘরে ঘরে। ফলে ঈদের দিনে মাংসের জন্য কাউকে কারও দ্বারে যেতে হয় না; বরং সমাজই সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দেয় প্রতিটি পরিবারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি শুধু মাংস বণ্টনের আয়োজন নয়; বরং পারস্পরিক সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জানা গেছে, ঈদুল আজহার আনন্দ সমাজের প্রতিটি মানুষের মাঝে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের দেওয়ান পাড়ায় শতবর্ষ ধরে চলে আসছে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।
ঈদের দিন মাংস বণ্টনের দায়িত্বে থাকা মাস্টার নাছির আহমদ বলেন, আমাদের সমাজে প্রায় ১৬৫টি পরিবার রয়েছে। এ বছর ৪২টি পরিবার কোরবানি দিয়েছেন। তারা ঈদের সকালে তাদের পশুর এক-তৃতীয়াংশ মাংস মসজিদের মাঠে জমা করেন। পরে মুরুব্বিদের উপস্থিতিতে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সেগুলো সমানভাবে ভাগ করে তালিকাভুক্ত পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো, কেউ যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। এ ধরনের উদ্যোগ মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য আরও বাড়িয়ে তোলে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ওসমান গনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, ঈদের সকালে কোরবানিদাতারা মসজিদের মাঠে মাংস নিয়ে আসেন। এরপর ব্যবস্থাপনা কমিটি তা প্যাকেটজাত করে বিতরণ করে। কেউ নিতে না এলে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। বহু প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য চলে আসছে আমাদের সমাজে।
প্রতিবছরের মতো এবারও সমাজের যারা কোরবানি দিতে পারেননি, তাদের জন্য একটি বড় গরু দিয়েছেন প্রবাসী শওকত। এ বিষয়ে তিনি বলেন, সমাজের সবাই যেন ঈদের আনন্দ সমানভাবে উপভোগ করতে পারেন, সেই চিন্তা থেকেই আমি প্রতিবছরের মতো এবারও সমাজের মানুষের জন্য একটি গরু কোরবানি দিয়েছি। আমার বিশ্বাস, একজনের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই আনন্দ সমাজের সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। সবার মাঝে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারলেই ঈদের প্রকৃত স্বার্থকতা আসে। সমাজের মানুষের পাশে থাকতে পারাই আমার সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টি।
স্থানীয়রা বলছেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজে আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়লেও দেওয়ান পাড়ার মানুষ এখনও ধরে রেখেছেন ভাগাভাগি ও সহমর্মিতার সেই পুরোনো সংস্কৃতি। শতবর্ষের এই আয়োজন তাই আজও মানবতা ও সামাজিক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে।
আরবিএন