সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতার অভিযোগে জাতিসংঘের কালো তালিকায় ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও জাতিসংঘের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কড়া অবস্থান বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
জাতিসংঘের বার্ষিক ‘সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতা (সিআরএসভি)’ প্রতিবেদনে সাধারণত যুদ্ধ বা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সংঘটিত যৌন সহিংসতার অভিযোগ, তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর তথ্য তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। চলতি বছরের প্রতিবেদনে ইসরায়েলকে কালো তালিকায় যুক্ত করার সিদ্ধান্তের খবর প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় তেল আবিব।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন এই সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক, লজ্জাজনক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলকে হামাসের মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে একই তালিকায় রাখা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও ঘোষণা দেন যে, আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত তার দপ্তরের সঙ্গে ইসরায়েল আর কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ রাখবে না।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অভিযোগ করেছে যে, জাতিসংঘ তার প্রতিষ্ঠাকালীন নিরপেক্ষতা হারিয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলকে রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করে আসছে। দেশটির কর্মকর্তাদের দাবি, জাতিসংঘ ইচ্ছাকৃতভাবে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে কাজ করছে।
তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিনিধিরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি। বহু বছর ধরে ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের অভিযোগ জমা পড়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া যুদ্ধের পর আটক ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি রিম আলসালেম বলেন, ‘ইসরায়েলকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা অনেক আগেই উচিত ছিল।’ তার মতে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো ছিল সুসংগঠিত, ব্যাপক এবং অত্যন্ত ভয়াবহ। তিনি দাবি করেন, স্বাধীন তদন্ত ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে এসব অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা পাওয়া গেছে।
গত আগস্টে জাতিসংঘ ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্য’ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছিল যে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গাজা থেকে আটক ব্যক্তিদের বিভিন্ন কারাগার ও আটক কেন্দ্রে অমানবিক আচরণের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তারা জাতিসংঘ প্রতিনিধিদের তদন্তে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতন একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর ও ধারাবাহিক পদ্ধতির অংশ। পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস আচরণ, যৌন নিপীড়ন এবং লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতনের অভিযোগও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শুধু ফিলিস্তিনিরাই নয়, গাজামুখী ত্রাণবাহী নৌবহরের কিছু আন্তর্জাতিক কর্মীও অভিযোগ করেছেন যে, ইসরায়েলি হেফাজতে থাকাকালে তারা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নজর কেড়েছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের খ্যাতনামা সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টফ ফিলিস্তিনি নারী ও পুরুষদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়। ইসরায়েল সরকার এই প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা ও মানহানিকর’ দাবি করে পত্রিকাটির বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে উঠে এসেছে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখো মানুষ।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ ও ইসরায়েলের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে ২০২৪ সালে ইসরায়েলে ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ওপর চাপ আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে এটি গাজা যুদ্ধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে বৈশ্বিক বিতর্ক সৃষ্টি করবে।
/ইউএমএইচ