দীর্ঘ ৩২ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন মেহারী ওবায়দিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার প্রবীণ শিক্ষক হাফেজ মাওলানা আবুল বাশার। তাঁর অবসর উপলক্ষে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়। শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় সিক্ত এ আয়োজনের নানা মুহূর্তে উপস্থিত শিক্ষার্থী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অতিথিদের চোখে অশ্রু ঝরতে দেখা যায়।
শনিবার (৩০ মে) সকাল ১০টায় মাদ্রাসার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো প্রাঙ্গণ প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। বহু বছর পর প্রিয় শিক্ষকের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতিচারণায় মেতে ওঠেন তাঁর অসংখ্য ছাত্র।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। স্বাগত বক্তব্যে প্রভাষক এইচ এম নুর-ই আলম বলেন, ‘একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন। মাওলানা আবুল বাশার তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।’
এইচ এম সাইফুল ইসলাম শাহিন ও হাফেজ মাসউদ আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) মো. ফয়েজুল কবির। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট শিল্পপতি মো. জহিরুল হক রাজিব ও জিয়াউল হুদা শিপন।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন হাফেজ আশিকুর রহমান, হাফেজ মুফতি বায়েজিদ, কাজিয়াতল দাখিল মাদ্রাসার সুপার মোস্তাফিজুর রহমান সরকার ইকবালসহ আরও অনেকে। এছাড়া বক্তব্য দেন কসবা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের অধ্যাপক মনির হোসেন, মাওলানা মাজেদুল ইসলাম, আমিনুল হক, আবু জাহের মাস্টার, হাফেজ মাহাদী হাসান রাজিব, হাফেজ মাসুদুর রহমান এবং জমশেরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শামসুল আলম।
বক্তারা বলেন, হাফেজ মাওলানা আবুল বাশারের হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্বীনের খেদমত, শিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর অবদান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে।
তাঁরা আরও বলেন, ‘একজন আদর্শ শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কর্ম, চরিত্র ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে মাওলানা আবুল বাশার সেই মর্যাদা অর্জন করেছেন। তাঁর মতো শিক্ষকেরা জাতির নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করেন এবং আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকেন।’
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষকের হাতে ৪ লাখ টাকা সম্মানী তুলে দেন। এ সময় আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেকেই।
ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার এ সম্মান গ্রহণ করে অশ্রুসিক্ত নয়নে হাফেজ মাওলানা আবুল বাশার বলেন, ‘আমি কোনোদিন ভাবিনি আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে এতটা ভালোবাসবে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তোমাদের ভালোবাসা ও দোয়া।’
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাবেক শিক্ষার্থীরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ স্মরণ করেন তাঁর কঠোর শাসনের কথা, আবার কেউ তুলে ধরেন পিতৃতুল্য স্নেহ ও মমতার স্মৃতি। সবার কণ্ঠে ছিল একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
দীর্ঘ ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে হাফেজ মাওলানা আবুল বাশার শুধু কুরআনের হিফজ শিক্ষা দেননি, গড়ে তুলেছেন অসংখ্য সৎ, আদর্শবান ও দ্বীনদার মানুষ। তাঁর বিদায়ের মধ্য দিয়ে মেহারী ওবায়দিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও অবদান শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
/এসএকে