৩০ মে বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান সংগঠক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে একদল পথভ্রষ্ট সেনা সদস্যের সামরিক অভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। একটি দেশের ইতিহাসে সাড়ে পাঁচ বছর হয়তো খুব দীর্ঘ সময় নয়, কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ এবং ভূ-রাজনীতিতে যে গভীর ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছিলেন, তা আজ ৪৫ বছর পর এসেও এ দেশের প্রতিটি স্তরে স্পন্দিত হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আবির্ভূত হওয়া এই রাষ্ট্রনায়ক এক চরম অনিশ্চিত ও দিশেহারা জাতিকে দিয়েছিলেন একটি স্পষ্ট দিক নির্দেশনা, একটি স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় এবং স্বনির্ভরতার এক নতুন মন্ত্র।
আজকের এই বিশেষ দিনে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি, যা বর্তমান বাংলাদেশের সংকট ও সম্ভাবনাকে বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে।
বহুদলীয় গণতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন
১৯৭৫ সালের মধ্যভাগে বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) নামক একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে। সংবাদপত্র স্বাধীনতা হারায়, চারটি মাত্র রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকা বাদে বাকি সব বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংকুচিত হয়।
জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন তার প্রধানতম চ্যালেঞ্জ ছিল এই অবরুদ্ধ ও একমুখী রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে দেশকে বের করে আনা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একটি স্বাধীন দেশের বিকাশ কখোনোই একদলীয় কাঠামোর মধ্যে সম্ভব নয়। রাজনৈতিক বহুমাত্রিকতা ফিরিয়ে আনাকে তিনি তার প্রথম কাজ হিসেবে গ্রহণ করেন।
তিনি সামরিক আইন বা ‘মার্শাল ল’ জারির মধ্যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলেও, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দেশকে বেসামরিকীকরণের দিকে নিয়ে যান। তিনি রাজনৈতিক দল অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে দেশে পুনরায় বহুদলীয় রাজনীতির দ্বার উন্মুক্ত করেন। এর ফলে নিষিদ্ধ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, বিভিন্ন ডানপন্থী ও বামপন্থী দলগুলো পুনরায় প্রকাশ্যে রাজনীতি করার আইনি অধিকার ফিরে পায়। বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাদপত্রগুলো আবার তাদের স্বাধীনতা ফিরে পায় এবং নতুন নতুন সংবাদপত্রের বিকাশ ঘটে। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল এই বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের একটি বাস্তব ও সফল প্রয়োগ, যেখানে দেশের প্রায় সবকটি প্রধান রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল।
রাজনৈতিক দল গঠন
বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি) গঠন করেন। বিএনপির গঠন প্রক্রিয়াটি ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভিনব ও যুগান্তকারী ঘটনা। জিয়াউর রহমান কেবল একটি নতুন দলই তৈরি করেননি, বরং তিনি দেশের চরম বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতি ছিল চরম মাত্রায় মেরুকৃত। একদিকে কট্টর বামপন্থী শক্তি, অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী এবং মাঝখানে মধ্যপন্থী জাতীয়তাবাদী চেতনা। জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত দূর করতে হবে। তিনি তার দলে মওলানা ভাসানীর অনুসারী প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক বামপন্থীদের স্থান দেন, মুসলিম লীগসহ মূলধারার ডানপন্থী শক্তির একটি বড় অংশকে মূল রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং একই সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধা, টেকনোক্র্যাট, বুদ্ধিজীবী ও মধ্যপন্থী জাতীয়তাবাদীদের বড় রকমের সমন্বয় ঘটান।
এই রাজনৈতিক ধারণাকে বলা যায় একটি ‘রামধনু জোট’ বা ‘সমন্বয়বাদী রাজনীতি’। এর মাধ্যমে তিনি চরমপন্থী রাজনীতিকে ম্রিয়মাণ করে একটি স্থিতিশীল ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলতে সক্ষম হন, যা পরবর্তী চার দশক ধরে বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে টিকে রয়েছে।
‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতি
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক অবদান হলো ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ধারণার প্রবর্তন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি করা হয়েছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে অনুধাবন করেছিলেন যে, ‘বাঙালি’ শব্দটির একটি কঠোর নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে কেবল বাংলাভাষী মানুষই বাস করে না; এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ, সাঁওতাল, গারো, চাকমাসহ বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অ-বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষও বাস করে। ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদের উগ্র প্রকাশ এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোকে এক ধরণের বিচ্ছিন্নতাবোধের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।
অন্যদিকে, ভারত ভেঙে যখন পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে রয়ে গেল এবং পূর্ববঙ্গ বাংলাদেশ হিসেবে স্বাধীন হলো, তখন ‘বাঙালি’ পরিচয়টি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে অস্পষ্টতা তৈরি করছিল। জিয়াউর রহমান তাই একটি নতুন ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দিলেন। তিনি পরিষ্কার করলেন যে, ভাষাগতভাবে আমরা বাঙালি হতে পারি, কিন্তু রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দেশের সকল নাগরিকের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ যেখানে মূলত ভাষা ও নৃতাত্ত্বিক অভিন্নতার ওপর জোর দেয়, যার ফলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে; জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ সেখানে দেশের ভৌগোলিক সীমানা, নাগরিকত্ব এবং সামগ্রিক সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়। এই সংজ্ঞাটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক এবং সমাজতাত্ত্বিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। এটি একদিকে যেমন এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক স্থান করে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি অমুসলিম ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোকে এই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পুরো ভূখণ্ডের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল।
একটি সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের মধ্যে তখনো এক ধরণের হীনমন্যতা এবং বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি এক ধরণের অতি-নির্ভরশীলতা কাজ করছিল। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়েও মানুষের ‘মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি’ বেশি জরুরি। তিনি দেশের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের উৎসাহিত করেন নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করতে।
তিনি স্লোগান দিয়েছিলেন, 'ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।' তার এই দর্শন দেশের সাধারণ মানুষের মনে এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল যে, আমরা কোনো বিদেশী শক্তির অনুকম্পা বা দয়ার পাত্র নই, আমরা একটি বীরের জাতি এবং আমাদের নিজস্ব সম্পদ ও মেধা দিয়েই আমরা বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব। এই আত্মমর্যাদাবোধই ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান মনস্তাত্ত্বিক ঢাল।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল মূলত রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বা সমাজতান্ত্রিক ঘরানার। কলকারখানা, ব্যাংক ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করার ফলে চরম অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। দেশ তখন আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত হয়েছিল এক ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে।
জিয়াউর রহমান এই অন্ধকার অর্থনৈতিক গোলকধাঁধা থেকে দেশকে বের করে আনার জন্য এক বৈপ্লবিক নীতি পরিবর্তন করেন। তিনি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে পিছু হটে 'মুক্তবাজার অর্থনীতি' এবং বেসরকারিকরণের নীতি গ্রহণ করেন। তিনি জাতীয়করণকৃত কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেন এবং বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেন। জিয়াউর রহমানের এই সাহসী ও পুঁজিবাদী সংস্কারের ফলেই বাংলাদেশে একটি উদ্যোক্তা শ্রেণি বা ব্যবসায়ী শ্রেণির জন্ম হয়, যা আজকের বাংলাদেশের সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।
জিয়াউর রহমান ভালো করেই জানতেন, বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। তাই শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন দিয়ে টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা অসম্ভব। এই চিন্তা থেকে তিনি শুরু করেন তার বিখ্যাত ‘১৯ দফা কর্মসূচি’, যার মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করা।
খাল কাটা কর্মসূচি: কৃষিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য তিনি নিজে কোদাল হাতে নেমে দেশব্যাপী ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কাটা কর্মসূচি’ শুরু করেন। এর ফলে হাজার হাজার মাইল নতুন খাল খনন ও পুরনো খাল পুনরুজ্জীবিত করা হয়, যা দেশের খাদ্য উৎপাদনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং দেশকে খাদ্য আমদানির নির্ভরতা থেকে মুক্ত করার পথ দেখায়।
গ্রাম সরকার: স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে তিনি ‘গ্রাম সরকার’ ধারণা প্রবর্তন করেন, যাতে গ্রামের মানুষ তাদের নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারে এবং উন্নয়নের সিদ্ধান্তগুলো যেন উপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে একদম নিচ থেকে উঠে আসে।
গণশিক্ষা ও পুষ্টি: নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য তিনি দেশব্যাপী গণশিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন এবং গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন বহুমুখী প্রকল্প হাতে নেন।
পোশাক শিল্প ও জনশক্তি রফতানি
আজকের বাংলাদেশ যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে গর্ব করে, তার প্রধান দুটি স্তম্ভ হলো তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। খুব কম মানুষই মনে রাখেন যে, এই দুটি খাতেরই আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে।
১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের সরকারের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতায় এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘দাইয়ু’ কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘দেশ গার্মেন্টস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। তিনি এই খাতের জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা এবং বিশেষ ঋণ সহায়তার ব্যবস্থা করেন, যা আজকের হাজার কোটি ডলারের পোশাক শিল্পের মূল ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।
একইসঙ্গে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যখন খনিজ তেলের কারণে ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ শুরু হয়, তখন জিয়াউর রহমান অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে সেই কূটনৈতিক সুযোগটি কাজে লাগান। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করেন এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রথমবারের মতো বিপুল পরিমাণ জনশক্তি রপ্তানি শুরু করেন। তার নেওয়া এই একটি সিদ্ধান্ত গ্রামীণ অঞ্চলের কোটি কোটি পরিবারের ভাগ্য বদলে দিয়েছে এবং দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের এক অবিরাম স্রোতধারা তৈরি করেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান
আজকের বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, ঠিক তখনই দেশি ও বৈশ্বিক রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে এমন কিছু অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হয়েছে, যেখানে জিয়াউর রহমানের নীতি ও দূরদর্শিতা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে চরম মেরুকরণ, পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আমরা লক্ষ্য করছি, তা থেকে উত্তরণের পথ জিয়াউর রহমানের ‘সমন্বয়বাদী রাজনীতি’র মধ্যেই নিহিত। আজকের এই বিভক্ত সমাজে যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতিতে লিপ্ত, সেখানে জিয়াউর রহমানের সেই ‘রামধনু জোট’ এবং সবাইকে সাথে নিয়ে পথ চলার নীতি এক বড় শিক্ষা হতে পারে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নূন্যতম একটি সমঝোতা তৈরি করা আজ সময়ের দাবি, যা জিয়া তার আমলে সফলভাবে করে দেখিয়েছিলেন।
বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে, বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে, তাতে বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনামলে যে পররাষ্ট্রনীতি প্রবর্তন করেছিলেন 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়', তা কেবল কাগজের কথা ছিল না। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করেছিলেন, আবার একই সাথে চীন ও সৌদি আরবের সাথে গভীর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, যা আগে ছিল না।
সবচেয়ে বড় কথা, দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যা ১৯৮৫ সালে ‘সার্ক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তা ছিল তার এক অসাধারণ ভূ-রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক। আজকের এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার যুগে বাংলাদেশের টিকে থাকতে হলে জিয়াউর রহমানের সেই ভারসাম্যমূলক ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দিকেই ফিরে যেতে হবে, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির কাছে নতজানু না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেওয়া হয়েছিল।
আজকের বাংলাদেশ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, খেলাপি ঋণের পাহাড় এবং ব্যাংক খাতের এক ধরণের কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন জিয়াউর রহমানের সেই 'উৎপাদনের রাজনীতি' এবং অপচয়রোধী কঠোর অর্থনৈতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার কথা মনে পড়ে। জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগত সততা এবং কঠোর পরিশ্রমের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজকের আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এক বড় অনুস্মারক। তিনি বিশ্বাস করতেন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া কোনো দেশ আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে না।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কোনো জাদুকর ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক এবং বাস্তববাদী রাষ্ট্রনায়ক। তিনি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন, তখন চারদিকে ছিল হতাশা, দুর্ভিক্ষ আর রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা। তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে, সততার মাধ্যমে এবং জনগণের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের মাধ্যমে সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি আধুনিক, গতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলেন।
আজ ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সর্বোত্তম উপায় হলো, তার রাজনৈতিক দর্শনকে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ যে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায়, সেই স্বপ্নকে ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। ইতিহাস কাউকে ভুলে যায় না, আর জিয়াউর রহমান তার কাজের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে এবং এই ভূখণ্ডের প্রতিটি ধূলিকণায় চিরকাল অম্লান থাকবেন।
লেখক-
আমির হোসাইন
কার্যকরী সদস্য, জিয়া পরিষদ