দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর নাবাতিয়াহ এখন ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক এই প্রাণকেন্দ্রটির পতন ঘটলে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া লেবানন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
২০০৬ সালের পর এই প্রথমবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লিতানি নদী অতিক্রম করেছে। শনিবার (৩০ মে) লেবাননের জ্যেষ্ঠ সামরিক সূত্র তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
উল্লেখ্য, এই লিতানি নদীটিকেই ইসরায়েল পূর্বে তাদের অনানুষ্ঠানিক ‘বাফার জোন’-এর সীমানা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে ইসরায়েলি সেনারা নাবাতিয়াহ শহরের উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়ে চূড়ান্ত ঘেরাওয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লেবাননের জনগণের কাছে ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই নাবাতিয়াহ শহর। আল জাজিরার প্রতিনিধি ওবায়দা হিতো টায়ার শহর থেকে জানান, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রতিরক্ষা স্তর ভেঙে শহরটিকে অবরুদ্ধ করার চূড়ান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিম বেকা উপত্যকাকে দেশের দক্ষিণ অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
একই সাথে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের অভিযান জোরদার করতে দক্ষিণ লেবাননের অন্তত ১০টি গ্রামের বাসিন্দাদের অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আরবি মুখপাত্র আভিচাই আদরাই সামাজিক মাধ্যমে সতর্ক করে বলেছেন, এলাকা না ছাড়লে বাসিন্দারা প্রাণহানির ঝুঁকিতে পড়বেন।
এই উচ্ছেদ আদেশ ও সামরিক তৎপরতা এমন এক সময়ে এলো যখন দুই দেশের কর্মকর্তারা স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা করছেন। প্রসঙ্গত, গত মার্চে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা শুরু করলে এই সংঘাত তীব্র রূপ নেয়।
ইসরায়েল তাদের এই অভিযানকে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের প্রচেষ্টা হিসেবে দাবি করলেও গত এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নামমাত্র ‘যুদ্ধবিরতি’ তারা বারবার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবারও (২৯ মে) ইসরায়েলি বিমান হামলায় দক্ষিণ লেবাননে অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের ফলে লেবাননের মানবিক পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। আল জাজিরার তথ্যমতে, দেশের ২০ শতাংশেরও বেশি মানুষ—অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত। বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের গাড়িতে অথবা পার্ক ও খোলা জায়গায় অস্থায়ী তাবু খাটিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
যদিও লেবানন সরকারের জন্য হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ, তবুও কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো দুই দেশ সরাসরি আলোচনায় বসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে আগামী সপ্তাহে নতুন দফার আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এক জরুরি বৈঠক করেছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, তারা মানবিক সংকট নিরসনে এবং যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে একমত হয়েছেন।
এছাড়া প্রেসিডেন্ট আউন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে ফোনে কথা বলেছেন এবং বর্তমান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে ইসরায়েলের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/জেডি