ইউক্রেনের বাঙ্কারগুলোতে এখন আর শুধু বারুদের গন্ধ নেই, সেখানে যোগ হয়েছে মনিটরের নীল আলো আর মাউসের ক্লিক। দূরনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চেয়ারে বসেই শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করছেন ইউক্রেনীয় আইটি বিশেষজ্ঞরা। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রুশ আগ্রাসনে ইউক্রেন যখন চরম সেনা সংকটে, ঠিক তখনই যুদ্ধের ময়দানে ত্রাস সৃষ্টি করেছে তাদের চালকহীন রোবট বাহিনী।
ইউক্রেনীয় সেনারা জানিয়েছেন, তাদের তৈরি চার চাকার এই বিশেষ বিস্ফোরকবাহী রোবটগুলোকে রুশ বাহিনী ডাকে ‘সাইলেন্ট ডেথ’ বা ‘নীরব মৃত্যু’ নামে। কারণ, মাত্র ১০ মিটার দূরত্বে আসার আগ পর্যন্ত এই ঘাতক রোবটের উপস্থিতি টের পাওয়া অসম্ভব।
সম্প্রতি পূর্ব ইউক্রেনে এমন মাত্র ছয়টি রোবট দিয়ে রুশ বাহিনীর তিনটি ফ্রন্ট লাইন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনের ‘এনসি ১৩’ ইউনিটের হিসাব মতে, এই একই সাফল্য পেতে আগে যেখানে আড়াই হাজার সেনা লাগত এবং শত শত প্রাণহানি ঘটত, সেখানে এখন কোনো রক্তপাত ছাড়াই কাজ হচ্ছে।
প্রযুক্তির এই দাপটে বদলে গেছে যুদ্ধের ব্যাকরণও। ফ্রন্ট লাইনের কমান্ডার মাইকোলা জিঙ্কেভিচ অকপটে স্বীকার করলেন, ‘আগে যুদ্ধ ছিল বীরত্ব ও শৃঙ্খলার, এখনকার যুদ্ধ শুধুই প্রযুক্তির।’
জনবলের ঘাটতি ঢাকতেই মূলত এই ড্রোন ও রোবটনির্ভর যুদ্ধকৌশল বেছে নিয়েছে ইউক্রেন। চলতি বছর প্রতি মাসে অন্তত ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল কিয়েভের, যা তারা সফলভাবেই করছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ (GCHQ)-এর তথ্যমতে, চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার নিহত সেনার সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫ লাখ ছাড়িয়েছে।
যুদ্ধের ময়দানে ইউক্রেনের রোবটগুলো এখন শুধু বোমা বহন করছে না, কোনো কোনো রোবটের মাথায় বসানো হয়েছে ব্রাউনিং ভারী মেশিনগান। দিনের পর দিন ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থেকে নিখুঁত নিশানা তাক করতে পারে এই যান্ত্রিক ঘাতকেরা। কেবল গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে বা ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হলে এরা ঘাঁটিতে ফিরে আসে। এমনকি সম্মুখসমরে সেনাদের কাছে খাবার, পানি ও রসদ পৌঁছে দেওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ কাজটিও এখন করছে এই রোবটগুলো। কাদা-মাটি মাড়িয়ে টানা ১০ ঘণ্টা পথ চলে বাঙ্কার থেকে বাঙ্কারে রসদ জোগাচ্ছে এই চালকহীন যান।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রের এই যান্ত্রিক জয়জয়কারের মধ্যেও রক্ত-মাংসের ইউক্রেনীয় সেনাদের ক্লান্তি আর মানবিক ট্র্যাজেডি আড়াল করা যাচ্ছে না। টানা এক বছর ফ্রন্ট লাইনে দায়িত্ব পালন শেষে ফেরা দুই সেনা ক্রো এবং ক্রিপি জানান, সার্বক্ষণিক রুশ ড্রোন হামলার মুখে খাদের ভেতর বস্তা সাজিয়ে বাঁচার মতো ন্যূনতম সুযোগও তারা পাচ্ছিলেন না।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যুদ্ধের গতি বাড়লেও, মাঠের সেনাদের মানসিক ক্ষত রয়েই গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত আকাশ আর মাটির এই অদৃশ্য যুদ্ধযন্ত্রগুলোই যে এখন ইউক্রেনের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় ঢাল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
সময়ের আলো/জেডি