ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠনের পর দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রতীকী পদক্ষেপের পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ইতোমধ্যে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং সীমান্তসংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করা। তবে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে সীমান্ত পার করে দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসার কথাও বলা হয়েছে।
নতুন কৌশলের আওতায় সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের যথাযথভাবে শনাক্ত, নথিভুক্ত এবং সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মানবিক, কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিষয়ও।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪৮ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে, তবে প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার এখনো অরক্ষিত রয়েছে। নদী, চরাঞ্চল ও জলাভূমির কারণে কিছু এলাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে বেড়া নির্মাণ সম্ভব নয়।
সীমান্তে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিএসএফকে প্রায় ৬০০ একর জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শিলিগুড়ির ফাঁসিদেওয়া এলাকায় নতুন করে সীমান্ত বেড়া নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। রাজ্য প্রশাসনকে দ্রুত বাকি জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় সীমান্তবর্তী জেলা—বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর ২৪ পরগনায় নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভূমি অধিগ্রহণ, আইনি জটিলতা, পুনর্বাসন, পরিবেশগত বাধা এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে পুরো সীমান্তে দ্রুত বেড়া নির্মাণ করা কঠিন হবে।
এছাড়া ১৯৭৫ সালের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তির ‘১৫০ গজ নীতি’ও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমারেখার খুব কাছাকাছি স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণে উভয় দেশের সম্মতি প্রয়োজন হয়। ফলে অনেক এলাকায় সীমান্ত বেড়া প্রকৃত সীমারেখা থেকে ভেতরে নির্মাণ করতে হয়, যা নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগণের জন্য নানা সমস্যার সৃষ্টি করে।
নদীবেষ্টিত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়াতে ভারত স্মার্ট ফেন্সিং, থার্মাল সেন্সর, ক্যামেরা, ড্রোন এবং রাডার প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও এগিয়ে নিচ্ছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও প্রচলিত সীমান্ত বেড়ার সমন্বয়ই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রধান উপায় হয়ে উঠতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, সীমান্ত সুরক্ষার পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি এবং জটিল। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলেও সব কাজ শেষ করতে আরও অনেক সময় লাগবে।
/ইউএমএইচ